<< পর্ব ৩ 

ডাক্তার চা বানিয়ে আনল দুজনের। চা খেতে খেতে অভিমন্যুকে বলল ওর DID থাকার কথা। অভিমন্যু কিছুতেই মানতে চায়না। ডাক্তার ওকে বোঝানোর চেষ্টা করতে থাকে যে ওর DID থাকাটা খুব স্বাভাবিক। ওর হিস্ট্রি, তার কারণে ট্রমা, ইনসোমনিয়া, এসব ক্ষেত্রে DID হওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অভিমন্যু এবার ধৈর্য হারায়। রেগে গিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলতে শুরু করেনা আমার ট্রমা নেই। আমার মেয়ে সুইসাইড করেছিল কিন্তু মণিকার মৃত্যু সুইসাইড নয়, আমার হাতে মরেছে। আমি সেটা সাজিয়ে সুইসাইড প্রমাণ করেছি। আমার কোনোদিন ট্রমা ছিলনা, আমার শুধু গিল্ট ছিল। আমার DID থাকতেই পারেনা।ডাক্তার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করেনআপনার স্ত্রী কে আপনি নিজে হাতে খুন করেছেন, এতদিন পরে সেটা আমাকে বলছেন!”

আমি ওকে খুন করিনি, ওটা একটা অ্যাকসিডেন্ট ছিল। সেদিন রাতে আমাদের ঝামেলা তুঙ্গে ওঠে। আমি ড্রাঙ্ক ছিলাম, সহ্য করতে না পেরে একজন কাউকে ফোন করে বলে আমাকে নাকি পুলিশে দেবে। আমি নিজেই পুলিশ, আমাকে কি পুলিশে দেবে! আমি আরও রেগে গিয়েছিলাম। তখনি পাশের ঘর থেকে কিছু পড়ে যাওয়ার আওয়াজ পেলাম। দরজা বন্ধ ছিল, জোরে ধাক্কা দিয়ে কোনোরকমে দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে দেখি সিলিং ফ্যান থেকে গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলছে আমার ১৮ বছরের মেয়েটা। মেয়ের ঝুলন্ত বডি দেখে মনিকা পাগল হয়ে গেছিল। চিৎকার করে বলছিল যে, ১২ বছর ধরে নাকি আমার অবহেলা সহ্য করতে করতে মেয়েটা সুইসাইড করল। এতক্ষন শুধু ঝগড়া চলছিল, এরপর পাগল হয়ে মণিকা আমাকে মারতে শুরু করল, ওকে আটকানো যাচ্ছিলনা। এইসব হতে হতেই হঠাৎ বেকায়দায় আমার হাতে ধাক্কা লেগে পড়ে গেল বেসিনের ওপর, বেসিনে মাথা ঠুকে নীচে পড়ে গেল। মাথা থেকে প্রচুর রক্ত বেরোচ্ছিল। স্থির হয়ে গেল, স্পট ডেথ। আমার কিছু করার ছিলনা। বাইরে জানাজানি হলে আমাকে জেল খাটতে হত। আমি সেইজন্য সব রক্ত ধুয়ে মুছে মণিকার বডিটা রান্নাঘরে রেখে একটা মোমবাতি জ্বালিয়ে গ্যাস সিলিন্ডার অন করে মেয়ের বডি নিয়ে নীচে চলে এসেছিলাম। একটা রিক্সা ডেকে মেয়ের বডিটা রিক্সায় তুলতে যাব এমন সময় ওপরে ব্লাস্টটা হল। এভাবে আমি ওটা সুইসাইড ফ্রেম করেছিলাম।এক নিঃশ্বাসে সবটা বলে চেয়ারে বসে পড়ে অভিমন্যু।

সব শুনে ডাক্তারের তো চোখ কপালে উঠেছে। জিজ্ঞাসা করেনমেয়ে মারা যাওয়ার পর মণিকা যাকে ফোন করে পুলিশ পাঠাতে বলেছিল, তার খোঁজ পাওয়া গেছিল?”

না, আমি তো রেগে গিয়ে ওর ফোনটা ছুঁড়ে ভেঙে দিয়েছিলাম। পরে আর খোঁজও নেওয়া হয়নি নম্বরটার……একমিনিট, আপনি কিকরে জানলেন মেয়ে মারা যাওয়ার পর মণিকা কাউকে ফোন করেছিল? আমি তো আপনাকে সেকথা কখনো বলিনি।অভিমন্যুর কপালে সন্দেহের ভাঁজ। উঠে দাঁড়াতে গিয়ে বুঝতে পারল ওর পা গুলো প্যারালাইজড হয়ে গেছে। আস্তে আস্তে গোটা শরীর ঝিমিয়ে পড়ছে।

কি করেছেন আপনি আমার সাথে? আমার এরকম হচ্ছে কেন? কি মতলব আপনার?” অভিমন্যু চিৎকার করতে থাকে।

ডাক্তারের মুখে একটা শয়তানি বাঁকা হাসি খেলে গেল। উঠে গিয়ে ব্যাগ থেকে একটা দড়ি বের করে এনে অভিমন্যুর গলায় বাঁধতে বাঁধতে বলেনমণিকার মৃত্যু যে সুইসাইড নয় সেটা আমি সেদিনই বুঝেছিলাম। আমাকে ফোন করে মেয়ের সুইসাইডের খবর দিয়ে পুলিশ পাঠাতে বলেছিল মণিকা। যে তার স্বামীকে পুলিশে দিতে চাইছে সে সুইসাইড কেন করবে? আর মনিকার মতো একজন ব্রিলিয়ান্ট ডাক্তার এত সহজে হার মানবে না। সেদিন ওর গলা শুনেই বুঝেছিলাম, আপনাকে জেলে না পাঠিয়ে ছাড়বেনা। পরদিন যখন জানতে পারলাম মণিকা গায়ে আগুন লাগিয়ে সুইসাইড করেছে, তখনই বুঝে গেছিলাম এটা সুইসাইড হতেই পারেনা, আপনিই মেরেছেন ওকে। চাইলে তখনই আমি আপনার ওপর এনকোয়ারি করাতে পারতাম, কিন্তু আমি আমার মণিকার মৃত্যুর বদলা অন্যভাবে নেব ঠিক করেছিলাম। একটা কেন, অনেক খুনের ভার চাপিয়ে যাব আপনার ওপর, আর শেষে আপনাকেও মেরে একটা চিঠি লিখে সেটা সুইসাইড প্রমাণ করব। প্ল্যান আমার অনেকদিন আগে থেকেই তৈরি ছিল, শুধু সঠিক সময়ের জন্য অপেক্ষা করছিলাম। আজ অবশেষে আমার বদলা পূর্ণ হবে।

         আর হ্যাঁ, আপনি ভাবতেই পারেননি না চায়ে আমি নিউরোটক্সিন মেশাতে পারি? আমার কাছে গ্যাস্ট্রিক আলসারের ওষুধ নেওয়ার কিছু তো ফায়দা আমি নেবোই। আপনার রক্তে নিউরোটক্সিন মেশানো খুবই সহজ কাজ, শুধু খাইয়ে দিয়েই করা যায়। আপনি ধরতেও পারবেননা।

গলায় দড়ি বেঁধে অভিমন্যুকে তুলছে ডাক্তার এমন সময় দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ে কিংশুক।হ্যান্ডস আপবলে ডাক্তারের দিকে পিস্তলের নলটা তাক করে।

আমাকে সিডেটিভ আনতে পাঠিয়ে ভুল করে ফেললেন ডাক্তার। ড্রয়ারের ফাইলটা খুলে আপনার সব টার্গেট দেখতে পেয়ে গেলাম। এরা সবাই আপনার পেশেন্ট ছিল তাইনা? যাদের খুন করা হয়ে গেছে তাদের ফটোতে তো ক্রস করে দিয়েছেন, অভিমন্যুর ফটোতে গোল করা আছে দেখেই বুঝে গেছিলাম আজ রাতেই এই কাজটা করবেন আপনি। সেইজন্যই তো আমি এখানে দরজার বাইরে দাঁড়িয়েছিলাম। আপনাদের সব কথাই শুনেছি, বাকিটা ওখানে গিয়ে বলবেন চলুন।

                      কনস্টেবল দুজন ডাক্তারকে অ্যারেস্ট করে বাইরে নিয়ে গেল। কিংশুকও বেরোতে যাবে ততক্ষনে অভিমন্যুর প্যারালাইসিস কমতে শুরু করেছে। কিংশুককে ডেকে অভিমন্যু বলে

তুই সবটা শুনেছিস কিংশুক? বিশ্বাস কর আমি ইচ্ছা করে……..”

কথা শেষ হতে না দিয়েই কিংশুক বলেওসব ছাড়। আমি তোর সাথে আর কাজ করবোনা। এই কেসটা শেষ হয়ে গেলেই আমি ট্রান্সফার নিয়ে চলে যাব। এত কন্সপিরেসি জানার পর আমার পক্ষে আর পুরনো দিনের মতো তোর সাথে ইনভ্লভড হওয়া সম্ভব নয়।বলে কিংশুক রুম থেকে বেরিয়ে যায়।

                      ডাক্তারকে অ্যারেস্ট করে নিয়ে যাওয়া হল CID Interrogation Room এ। সারারাত ধরে জেরা করে যা জানা গেল সেটা এরকম—–

ডক্টর সিকদার এবং অভিমন্যুর স্ত্রী মণিকা একই হসপিটালে কলিগ ছিলেন। সেখান থেকেই তাদের পরিচয় এবং পরবর্তীকালে মণিকার প্রেমে পড়েন উন্মেষ। কিন্তু মণিকার দিক থেকে কোনোরকম দুর্বলতা ছিল না উন্মেষের প্রতি, ভালো বন্ধু হিসেবেই ছিলেন দুজনে। মণিকা মারা যাওয়ার পর অভিমন্যুর ওপর বদলা নেওয়ার পরিকল্পনা করেন উন্মেষ। আরও সুবিধা হল যখন অভিমন্যু ওর ট্রিটমেন্ট ডক্টর সিকদারের কাছেই করাতে শুরু করে। ডাক্তার অভিমন্যুকে এমন কিছু ওষুধ দিতেন যেগুলো খাওয়ার কারণেই অভিমন্যুর ইনসোমনিয়া হয়। সেটা যদিও কিংশুক আগেই জেনে গেছিল যখন অভিমন্যুকে ওর ফ্ল্যাটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তখন একবার কিংশুক অফিসে গিয়ে ডক্টর ঋতই দাসের সঙ্গে দেখা করে আর ডাক্তারের ফাইল থেকে লুকিয়ে নিয়ে আসা অভিমন্যুর পেসক্রিপশন দেখায় ডক্টর দাসকে। ডক্টর দাস সেটা দেখে বলেন যে, BP আর ইনসোমনিয়ার ওষুধগুলো যে ডোজে দেওয়া হয়েছে তাতে ওর ইনসোমনিয়া আর হ্যালুসিনেশন আরও বেড়ে যাওয়ার কথা। প্রতিদিন দুপুরে ডাক্তার থেরাপির সময় অভিমন্যুকে হিপনোটাইজড করে এমন ট্রেনিং দিত যাতে তিনটে রিং হওয়ার পরে কিছুক্ষণ থেমে আরেকটা রিং হলেই সে উঠে যায় আর তারপর হাঁটতে শুরু করে। সেদিন যখন কিংশুক ফাইল আনতে গেছিল তখন ডাক্তার অভিমন্যুর কানে পরবর্তী ভিক্টিমের নাম বলে দিয়েছিল যার ফলে অভিমন্যু সেই নাম ধরে তাকে মারতে যাবে বলতে থাকে। ডায়ালগও সব মুখস্ত করানো হয়েছিল অভিমন্যুকে।

সবই তো বুঝলাম এবার জবানবন্দি দিন, বাকী খুনগুলো কেন করলেন?” কিংশুক জিজ্ঞেস করে ডাক্তারকে।

ডাক্তার একটা বাঁকা হাসি দিয়ে বলেআমার উদ্দেশ্য ছিল শুধু অভিমন্যুকে ফাঁসানো, খুনগুলো একটাও আমি করিনি।

তাহলে খুনের সময়, ভিক্টিমের নাম, অ্যাড্রেস এসব কীকরে জানতেন আপনি? অভিমন্যুকে খুনের সময় সেখানে পাঠাতেন কীভাবে?”

খুনের দিন সকালে একটা ফোন আসত আমার কাছে যেখানে কেউ আমাকে ওইসব ডিটেলস বলে দিত আর আমি সেদিন দুপুরে সেইমতো অভিমন্যুকে ট্রেনিং দিতাম। প্রথম দিন অতটা গুরুত্ব দিইনি কলটাকে। কিন্তু পরেরদিন পেপারে দেখলাম খুনটা সত্যিই হয়েছে। তখনই আমি ফন্দি আঁটলাম যদি অভিমন্যুকে Sleepwalking করানো যায় অ্যাড্রেস পর্যন্ত তাহলে ওকে ফাঁসানো যেতে পারে। যেহেতু খুনি এক্ষেত্রে মার্ডারস্পটে কোন প্রমাণ রেখে যায়না, তো আমি সহজেই অভিমন্যুকে খুনি ফ্রেম করতে পারব ওকে হিপনোটাইজ করে। কিন্তু একটা ব্যাপার, DID ইচ্ছা করে ইমপোজ করা যায়না।

এইসব বলে ডাক্তার কিংশুককে সেই ফোন নম্বরটা দিল যেটা থেকে প্রত্যেকবার ফোন যেত ডাক্তারের কাছে আর খুনের ডিটেলস বলা হত। কিংশুক সার্চ করে দেখল সেটা অভিমন্যুর ফ্ল্যাটের পাশেরই একটা লোকাল বুথের নম্বর।

                       এদিকে অভিমন্যু রাত্রিবেলা উঠেছে জল খেতে। ডাইনিং টেবিলে রাখা আছে জলের বোতল। জল খেতে গিয়ে দেখে সামনের জানালাটা খোলা, বন্ধ করতে ভুলে গেছে বোধহয়। জল খেয়ে গিয়ে জানালাটা বন্ধ করে পেছন ফিরতেই আঁতকে ওঠে অভিমন্যু, দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে আসছেন ডক্টর ঋতই দাস, হাতে স্ক্যালপেল।আপনি কখন ভেতরে এলেন? কী চান আপনি? হাতে ওটা কী?” বলতে বলতেই অভিমন্যু অনুভব করে ওর পাগুলো কেমন অবশ হয়ে আসছে, দাঁড়িয়ে থাকতে পারছেনা। মাটিতে পড়ে গেল অভিমন্যু, আস্তে আস্তে গোটা শরীর প্যারালাইজড হয়ে যাচ্ছে। টেবিল থেকে একটা পেপার আর পেন নিয়ে অভিমন্যুর সামনে এসে বসল ডক্টর দাস।

হ্যাঁ, সবকিছুর পেছনে আমিই ছিলাম। উন্মেষের সাথে আমার পরিচয় হয় নর্থ আমেরিকার কনফারেন্সে। ব্ল্যাক উইডোর ভেনাম যে নিউরোটক্সিন হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে সেটাও তো আমারই আইডিয়া। ওর কাছে জানতে পারি মণিকা মারা যাওয়ার ঘটনাটা। তো বদলা নিতে চাইতোই আপনার ওপর আর আমার শখও তো এটাই, সবাইকে পাপের পরিমাণমতো শাস্তি দেওয়া। হ্যাঁ আমিই Adrasteia, আমিই Nemesis আমিই সব খুনের দিন সকালে আপনার ফ্ল্যাটের পাশের লোকাল বুথ থেকে উন্মেষকে ফোন করে দিতাম। তারপর আপনাকে ফ্রেম করার বাকী কাজ উন্মেষ করত আর ওদের শাস্তি দিতাম আমি। এখন এই চিঠিতে আমি লিখে যাব আপনার সমস্ত কীর্তি, এটাই যে, আপনি সব খুনগুলো সজ্ঞানে করেছেন। ডক্টর উন্মেষের মোটিভ জানার ইচ্ছা ছিল আপনার তাই ডাক্তারের সামনে আপনি হিপনোটাইজড হওয়ার অভিনয় করে গেছেন। আর কিংশুকও তো আপনার সব সত্যি জেনেই গেছে, এরপর আপনার পক্ষে আর বাইরে মুখ দেখানো সম্ভব নয়। এত পাপের ভার নিতে না পেরে শেষমেশ আজ সুইসাইড করছেন। এটাই হবে আপনার সুইসাইড নোট।

                         চিঠিটা পুরো লিখে ফেলল ঋতই। শেষেআমিই ADRASTEIA” লিখে ADRASTEIA শব্দটার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। বর্ণগুলো উল্টেপাল্টে ‘ADRASTEIA’ থেকে যেন হয়ে গেল ‘RITAE DAS’

 

যুগ্মকলমে ঋতশ্রী সূত্রধর ও রিজু মোদক (পশ্চিমবঙ্গ)

 

<< পর্ব ৩                                                                               


Jooble Presents Quarterly Creative Writing Competition

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here