ওরা বলে ওরা ইটভাটায় থাকে। আসলে থাকে ভাটার পুবদিকে, বিস্তীর্ণ জায়গা জোড়া, কাঁচা ইটের শৃঙ্খলাপরায়ণ কলোনির ওইপারে… টুকরো ইট, মাটি, খাপরা আর মর্চে পড়া টিনের তৈরি, কয়-ঘর আটচালার একটায়। মহুলসলা জোড়ের পাড় ঘেঁষে। মুমূর্ষু আস্তানা থেকে একটু দূরে, জোড়ের বাঁক পেরলেই শ্মশান। আঞ্চলিক ভূগোলের এক-প্রান্তে আর অর্থনৈতিক ভূগোলের শেষ সীমায়, ধুঁকতে থাকা প্রান্তিক জীবন- রামদিন মিশির ও তার পরিবারের। এতটাই প্রান্তিক যে, সমগ্র অঞ্চলের যাপনের চালচিত্রে, রামদিন ও তার পরিবারের অস্তিত্ব, কোন রেখাপাত করে না। অকিঞ্চিতকর জীবন। থাকল কী থাকল না, বাঁচল কী বাঁচল না, তা নিয়ে কারও মাথা ব্যথা নেই।

    তবে রামদিন এখানে বাঁচতেই এসেছিল। সেই সুদূর জামতাড়া থেকে। সে বহুদিন আগেকার কথা। পনেরো-কুড়ি বছর তো হবেই। রামদিন সেখানে কী করত, কেউ জানে না। অথবা করত না কিছুই। হয়ত বা করে উঠতে পারেনি তেমন ভাবে। সঙ্গতি যে ছিল না বোঝাই যায়, তাই সঙ্গত কারণেই, নিজের ‘গাঁও’ ছেড়ে, তাকে চলে আসতে হয় এই বাংলায়। গঙ্গাপুরের এই মফস্বলে, একটা চলনসই জীবনের আশায়। এসে উঠেছিল, ইটভাটা লাগোয়া, এই ভাঙাচোরা, টিন দেওয়া খাপরার চালাঘরে। সেই থেকে লোহার গায়ের নাছোড়বান্দা মরচের মত, রয়ে গেছে এখানেই। আর যেতই বা কোথায়! মাথার ওপর নিখরচার ছাদ ছেড়ে, অন্য কোথাও যাওয়া যে আত্মহত্যার সামিল, সেটুকু না বোঝার মত নির্বোধ- রামদিন ছিল না। কাজ নিয়েছিল ভাটায়। তখন তার বয়স কত হবে… আন্দাজ তিরিশের মাঝামাঝি!

    রামদিনের বউ শিবানীকে, তখন তারই মেয়ে বলে ভ্রম হত। দু’জনের বয়সের ফারাক কল্পনাতীত। অন্তত সাধারণ বাঙালির কল্পনা, সে ফারাকের ব্যাপ্তি ধারণ করতে অপারগ। দুগ্গাপুজোয় কলাবউকে যেমন মার্কিন জড়িয়ে ঢেকে রাখা হয়, তেমন নিজেকে ঘোমটার বিশাল ঘেরাটোপের আড়ালে, লুকিয়ে রাখত সে। কাজেই তখন কেমন দেখতে ছিল, সেটা রামদিন ছাড়া আর কেউ বলতে পারবে না; তবে এখন বয়স বেড়েছে। সময়ের সাথে সাথে, ঘোমটার পাড় থেকে, অনেক স্বপ্ন, সম্ভ্রম আর শালীনতা, অভাব নামক যাঁতাকলে, নিরন্তর পেশাই হতে হতে, একদিন বিরক্ত হয়ে খসে পড়ে গেলে, বোঝা যায়- বউটা কম বয়সে সুশ্রী ছিল। অবশ্য এখনও তার খুব যে বয়স, তা নয়। বছর পঁয়ত্রিশ হবে; কিন্তু প্রতিনিয়ত জীবনযুদ্ধের পদাতিক সেজে, অভাব আর অনটনের সঙ্গে লড়াই করতে করতে, শরীর ভেঙে গেছে তার। গাল বসে গেছে। চোয়ালের হাড় বেরিয়ে এসেছে। চোখের তলায় গাঢ় কালচে পরত। শীর্ণ বাহু। দীর্ণ বক্ষ। কীর্ণ চুল। রণক্লান্ত। লড়াইটা যে শুধু অভাবের সঙ্গে নয়। রামদিনের সঙ্গেও বটে। কারণ, বিয়ের পর থেকে রামদিন ওর চোখের থেকে, আজীবনের জন্য ঘুম কেড়ে নিয়েছে…

    মূল কারণ, বংশ বিস্তারের প্রতি রামদিনের প্রভূত দুর্বলতা, বা আসক্তি; হয়ত বা বাধ্যবাধকতা। একটা সন্তান মানে, একজোড়া উপার্জনক্ষম হাত। পুত্রসন্তানই বেশি কাম্য, কিন্তু রামদিনের কপালে বিধি বামা! একবার করে কন্যা জন্ম দেয় রামদিনের বউ, আর রামদিন ছটফট করতে থাকে। কোলে বাচ্চা নিয়ে, বিনিদ্র রজনী কাটিয়ে, হাড়মাস কালি করে, এক-দেড় বছর বাদে, যখন শিবানী একটু দুপুরের ঘুমের স্বপ্ন, জেগে জেগে দেখতে শুরু করেছে, ঠিক সেই সময়, আর একটা বীজ রামদিন, প্রোথিত করে ফেলে বউয়ের গর্ভে। হয়ত বা বিনি পয়সার বিনোদন। ভিখিরিও তো আমোদিত হতে চায়। আদিম রিপু কোনদিনই শ্রেণী-বিন্যাস মানেনি। তাই আবার, গর্ভধারণের গুরুভার বহন করতে গিয়ে, রামদিনের বউয়ের ঠিকরে বেরিয়ে আসা চোখে, ঘুমও আর নামে না। একপাল বাচ্চার, অক্ষয় জননী হয়ে, কোনমতে বেঁচে আছে। মাঝে দু’-একটা মরেও গেছে। রামদিনের সব থেকে বড় সন্তান যে মেয়েটি, তার কন্যা আর রামদিনের সর্ব কনিষ্ঠ কন্যা ‘রানি বিটিয়ার’ বয়স- প্রায় সমান। তিনবছরের কাছাকাছি। কনিষ্ঠতমাটির মাথার ওপরেই, আর একখানি মেয়ে আছে- ‘সোনি’- মেরে কেটে একবছরের তফাত!

    ইটভাটায়, বেশ কয়েক বছর কাজ করেছিল রামদিন। শরিকি-জটিলতায়, ভাটার ব্যবসা পড়তে পড়তে, একদিন থেমে যায়। ইতস্তত পড়ে থাকে, শুধু ভাঙা ইটের স্তূপ আর জলে গলে যাওয়া, কাঁচা ইটের মাটির, জমে থাকা স্রোত; আর পড়ে থাকে কয়েকটা কাজ হারানো পরিবার… গোপাল ভকতের, শিউ পূজনের, বাচ্চু মণ্ডলের… ওই ভাঙা ইঁটের টুকরোর মতই!

    পেশা বদলায় রামদিন। ইটভাটার শ্রমিক থেকে, হয়ে যায় নাপিত, তবু আর্থিক অসঙ্গতি পেছন ছাড়ে না। বরং এতগুলো পেটের ভাত জোগাড় করতে, নাভিশ্বাস উঠে যায় রামদিনের। মাঝে দু’টো ছেলে আছে বটে, কিন্তু তাদের পাত্তাই পাওয়া যায় না। সারাদিন কোথায় যে টইটই করে ঘুরে বেড়ায়, তা কেবল ওরাই জানে। যে উদ্দেশ্যে নিয়ে বংশবিস্তারে ব্রতী হয়েছিল রামদিন, তা এখনো অবধি সফল হয়নি। হাল-ফ্যাশানের সেলুনের জমানায়, কেই বা এখন রাস্তার ফুটপাথে বসে চুল কাটে, দাড়ি ছাঁটে!- তবুও পেটের তাড়নায়, একটা কাঠের বাক্স ঝুলিয়ে, তাতে একটা কাঁচি, একটা ময়লা চিরুনি, একটা বাটি, একটা দাড়ি কমানোর ব্রাশ আর একটা ক্ষুর ভরে, গঙ্গাপুরের রাস্তায় রাস্তায়, আমদানির আশায় ঘুরে বেড়ায় রামদিন। কয়েকটা টাকার জন্য। কয়েকটা টাকা। তাহলেই একটু চাল কেনা যাবে আর একটু নুন… ফেনা ভাত অন্তত, দু’-এক খাবলা, ছেলে মেয়েদের মুখে তুলে দেওয়া যাবে… ক্ষুধাতুর চোখ মেলে, ওরা পথ চেয়ে থাকে তার। রামদিন তাকাতে পারে না ওদের মুখের দিকে! নিজের শরীরেও, আর খুব একটা শক্তি অবশিষ্ট নেই তার। কৃপণ ভাগ্যের সাথে, সেই কবে থেকে, সংগ্রাম করতে করতে, সব জীবনীশক্তি ক্ষয়ে গেছে তার। খিদেও এখন আর পায় না। অথবা পায়। আসলে অনবরত ‘খিদে খেয়ে থাকতে থাকতে’- খিদের অনুভুতি জয় করে ফেলেছে রামদিন। ওরা পারেনি। ছোট্ট শিশুরা সব! রামদিনের কানে, কেবল পিঠোপিঠি, ছোট মেয়ে দু’টির কণ্ঠস্বর বেজে চলে…..

বাউজি আ গয়া!

বাউজি আ গয়া!

-বাবা মানেই দু’-মুঠি চাল, একটু নুন…

    সারাদিন রোদে পুড়ে, চারটি লোকের মাথা মুড়িয়ে, বিস্তর দরাদরির পর, হাতে কিছু টাকা নিয়ে, বাড়ি ফেরে রামদিন। তখন সন্ধে হচ্ছে। মনটা কিঞ্চিৎ প্রসন্ন। আজ তিনদিন পরে, নগদ আমদানি হয়েছে হাতে। ঘরে চাল যা ছিল, গতকালই শেষ হয়ে গেছিল। রাতে খেতে বসে, হাঁড়ির ভেতর হাতার আওয়াজটা, কানে বেজেছিল। হাঁড়িটা টান মেরে দেখে- একহাতা ভাত পড়ে আছে তলায়। বউটার তখনও খাওয়া হয়নি। শিবানী বরাবর সব শেষে খায়। রামদিন আর গ্রাস মুখে তোলেনি। ভাতের শেষহাতা, বউয়ের পাতে বেড়ে, জল খেয়ে, ঢেকুর তুলে, উঠে পড়েছিল সে। বাচ্চারা খেয়েছে কি না জিজ্ঞেস করায়, ক্ষীণ কণ্ঠে বউ জানিয়েছিল, তিনহাতা ভাত, সকলকে ভাগ করে খাইয়ে, বেশ করে জল খাইয়ে দিয়েছে সে। অর্থাৎ সকলেই প্রায় অভুক্ত। নিজের প্রতি রাগে, ক্ষোভে, ঘেন্নায়, মাটিতে মিশে যেতে চাইছিল রামদিন! চালার বাইরে দাঁড়িয়ে, রাতের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভাবছিল, জীবনের এই অনন্ত অন্ধকার কবে একটু হলেও কাটবে!- কিন্তু উত্তরহীন জমাট অন্ধকার ছাড়া, আর কিছু চোখে পড়েনি তার…

    আজ ঘরের কাছে আসতেই, জো-রে হাঁক পাড়ল রামদিন…

রা-নি বি-টি-য়া… সো-নি… কাঁ-হা… হ্যা-য়… রে…?

হোগা আসপাস! রামদিনের আওয়াজ পেয়ে, টিনের দরজা খুলে, বেরিয়ে আসতে আসতে বলল শিবানী। জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে রইল, রামদিনের মুখের দিকে, এক উদগ্রীব প্রত্যাশায়…

    এই চাহনির ভাষা জানে রামদিন। একগাল হেসে, চোখের ইশারায়, আশ্বস্ত করে বউকে। বলে- আজ আমদানি হুয়া হ্যায়। চাওল লে কর আয়া হুঁ। বঢ়িয়া সে চাওল পকা।

একটা প্লাস্টিকের প্যাকেট তুলে দেয় শিবানীর হাতে। বউয়ের মুখ থেকে, মেঘের একটা আস্তরণ, হালকা করে সরে যায়।

    মহুলসলার জোড়ে হাত-পা ধুতে যায় রামদিন। মনটা বেশ হালকা লাগছে আজ। এরকম আমদানি যদি পরপর কয়েকদিন হয়, তাহলে ডাল কিনে আনবে…. কাঁধের গামছাতে, হাত-মুখ মুছতে মুছতে ভাবে রামদিন। কতদিন হয়ে গেল, একটু রহড়ডাল খাওয়া হয়নি! কল্পনা জিভে জল এনে দেয় রামদিনের। ততক্ষণে সন্ধে হয়ে গেছে। রানি আর সোনিকে দেখতে না পেয়ে, মনটা একটু খারাপ লাগল রামদিনের। কোথায় যে যায় মেয়েদু’টো! ঘরে থেকেই বা কী করবে…. গেছে হয়ত ভকতের বাড়ি, গোপালের ছেলের সাথে খেলতে। ভারী মিষ্টি মেয়ে দু’টো। সোনিটার আবার হাসলে, টোল পড়ে গালে। রানিটা তুলনায় একটু গোলগাল। সোনির একহারা চেহারা। দু’জনেরই গায়ে জামার বালাই থাকে না। চটা পড়া চুল, গায়ে ধুলোর আবছা আবরণ। সারা বছর সর্দি লেগেই আছে। শুকিয়ে যাওয়া শিকনির রেশ, সবসময় নাকের নীচে আর গালে লেগে থাকে। দু’টোরই পরনে শুধু জাঙ্গিয়ার মত, একজোড়া ঢিলে প্যান্ট। রামদিন যতক্ষণ থাকে, দু’টিতে মিলে কেবল বকবক করেই যায়…

-আরে দেখ্ না, কাঁহা গয়ি বচ্চিয়াঁ

ওদের দু’টিকে দেখতে না পেয়ে রামদিনের মন ঈষৎ উতলা

ইতনা উতাওলা কাহে লা হোতে হ্যাঁয় আপ! আ যায়েগি! চাল ধুতে ধুতে, মিনমিন করে বলে ওঠে শিবানী। ঘড়ি নেই রামদিনের, তবে বুঝতে পারে, সন্ধে অনেক ঘনিয়েছে। এতক্ষণ তো ঘরের বাইরে, থাকে না ওরা। পাশে গোপালের চালায় টোকা দেয় রামদিন-

রানি বেটিইইই… সোনিইইই…- হাঁক পাড়ে সে!

নেহি আয়া – ভেতর থেকে ভকতের বউ উত্তর দেয়!

    শিউ পূজনের ঘরে, বাচ্চু মণ্ডলের আটচালার ঘরে খোঁজ নেয়। সেখানেও পাওয়া যায় না মেয়ে দু’টোকে। গেল কোথায়? চিন্তায় পড়ে যায় রামদিন। ঘরে ফিরে বউকে জানায়। শিবানী থমকে যায়। ফুটন্ত জলের হাঁড়িতে চাল ফেলে, উঠে দাঁড়ায় বিচলিত শিবানী। কী হল! কোথায় গেল মেয়ে দু’টো? ঘরে, মাটিতে শুয়ে থাকা অন্যান্য ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করে, কেউ বলতে পারে না। ওদের মধ্যে একটি জানায় যে, বিকেলে ওরা ভাটার ইটের কাছে খেলছিল, তারপর আর খেয়াল করেনি। ভাটার দিকে তাকিয়ে জোরে ডাক দেয় রামদিন-

এ রানিইইইই…

এ সোনিইইই…

চাওল পক গ্যায়া রে…

ওদিক থেকে প্রশ্নের কোন জবাব আসে না!

  ত্রস্ত পায়ে ভাটার দিকে হাঁটা দেয় রামদিন। অন্ধকারে হোঁচট খেতে খেতে, ভাটার একমাথা থেকে আর একমাথা, তন্নতন্ন করে খোঁজে। খেলতে খেলতে যদি কোথাও ঘুমিয়ে পড়ে থাকে বাচ্চাদু’টো! কাউকে পাওয়া যায় না, শুধু অন্ধকার আর শূন্যতা হাতে আসে তার… দুশ্চিন্তায় ঘামতে থাকে রামদিন। উদভ্রান্তের মত, ভাটা ছেড়ে রাস্তা ধরে হাঁটা লাগায় সে… কতদূর যাবে এখন! … এ রাস্তা তো শ্মশান পেরিয়ে, বাজার পেরিয়ে, সে-ই স্টেশনে গিয়ে উঠেছে! তার মাঝে এদিক-ওদিক গলিপথ। ওইটুকু বাচ্চা, এতদূর তো যাবে না…. যাওয়ার প্রশ্নই নেই…. শ্মশান অবধিই ওরা একা যায়নি কখনও। তাহলে কি কেউ তুলে নিয়ে গেল ওদের! বাচ্চা-চুরি??? এরকম ঘটনার কথা তো, বাজার এলাকায় শোনে সে! তার কপালেই শেষে! কাঁপতে কাঁপতে রাস্তা দিয়ে ছুট্ মারে রামদিন। যাকেই দেখে প্রশ্ন করে-

মেরি বচ্চিকো দেখা? রানি! সোনি! … মেরা বচ্চা…

  মানুষ পড়শিরই খোঁজ রাখে না, তো রামদিনের বাচ্চার খবর রাখতে লোকের বয়ে গেছে। তাও আবার এই রাত আঁধারে। সকলেই মাথা নেড়ে ‘না’ বলে। রানি-সোনিকে ঘিরে অশুভ আতঙ্কে দিশাহারা হয়ে পড়ে সে। মেয়েদু’টো যেন উবে গেছে পৃথিবী থেকে! কোথায় খোঁজ করবে- ভেবে কূল কিনারা করে উঠতে পারে না রামদিন। খোঁজ করতে করতে প্রায় বাজারের কাছে এসে পড়ে। এদিকটায় বেশ জমজমাট। ব্যস্ত মানুষের আনাগোনা। ভিড়। এর মধ্যে কীভাবে খুঁজে পাবে মেয়েদের! এতদূর ওরা নিজেরা আসতেই পারে না! নিজেকে প্রবোধ দেয় রামদিন। নিশ্চই বাড়ি ফিরে এসেছে এতক্ষণে। তাহলে কি বাড়ি ফিরে যাবে? ফিরে গিয়ে একবার দেখবে?… না পেলে তখন না হয় আবার… আশঙ্কায় হাত-পা ঝিমঝিম করে ওঠে তার। হাতে গামছাটা নিয়ে পাগলের মত দৌড়তে থাকে বাড়ির দিকে…

    শ্মশানের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়। এদিকটা তো দেখা হয়নি! তখন শ্মশানে অনেক লোকের ভিড়। বেশ কয়েকটা দাহকার্য হচ্ছে। দাউদাউ করে জ্বলছে চিতার আগুন। আবছায়া মানুষের জটলা আগুন ঘিরে। আগুনের হলকায় তাদের মুখ-চোখ চকচক করছে। এখানে আসেনি তো মেয়েদু’টো! কত লোক আসে যায় শ্মশানে, তুলে নিয়ে যায়নি তো! কার মনে কী আছে, কে বলতে পারে! রামদিন শ্মশানের ভেতর ঢুকে পড়ে। বিষণ্ন মানুষের নিথর ভিড়ের মাঝে, ভালো করে ঠাহর করে, উঁকি মেরে দেখে। এই চিতা থেকে ওই চিতা… পবন ডোমকে জিজ্ঞেস করে, লাভ হয় না। চব্বিশ-ঘণ্টা চোলাইয়ের ঘোরে কাটে ওর। এত মৃতদেহ সৎকারের গুরুদায়িত্ব, তার নেশাতুর হৃদয়ে। ঘোরের মধ্যে মাথা নাড়ে সে। মড়ার ‘বডি’ ছাড়া, জ্যান্ত বডির হিসেব রাখার দায় নেই তার। চেলাকাঠ, পাট, খই মাড়িয়ে, রামদিন খুঁজতে থাকে মেয়েদের… সে-ও কেমন যেন একটা ঘোরের মধ্যে, অন্ধকার চষে ফেলে মেয়েদের জন্য… পৌঁছে যায় শ্মশানের শেষ সীমানায়- যেখানে ঘাটের ঢালু মহুলসলা জোড়ের জলে নেমে গেছে। ছেঁড়া কাপড়, লেপ, তুলো, মালসা, পোড়া কাঠ- যেখানে একে অপরের সাথে জড়াজড়ি করে, মরে পড়ে আছে! এখানে সবাই মালসায় রাঁধা পিণ্ড ফেলে যায়। অনতিদূরে, পাড়ে, ঝোপজঙ্গল। এক মানুষ সমান পুটুসের ঝাড়, আকন্দ আর কাঁটা গাছের ঘন আবাদি। রাতে এইখান থেকে শেয়ালের ডাক ভেসে আসে…

    মেয়েদু’টোর চিহ্ন নেই কোথাও। হাঁপিয়ে ওঠা রামদিন, পাড়ে দাঁড়িয়ে পরে। কাল রাত থেকে খাওয়া নেই, তায় সারাদিনের পরিশ্রম… চব্বিশ ঘণ্টা প্রায় হতে চলল। মাথা ঘুরতে থাকে ওর। টালমাটাল পায়ে পাড় থেকে নামতে যাবে, এমন সময়, সামনের ঝোপ থেকে জোরে, খসখস শব্দ ভেসে এল তার কানে। কিছু একটা নড়ছে ঝোপের গায়ে! শেয়াল? হবে হয়ত… চলে যেতে উদ্যত হলে, আবার শব্দ পায় সে। চাপা স্বরে হাসির আওয়াজ মনে হল যেন! ভ্রম না সত্যি? এক লহমায় জোড়ের পাড়ে লাফ দিয়ে উঠে, ঝোপের দিকে পা-টিপে টিপে, শ্বাস বন্ধ করে, এগিয়ে গেল রামদিন। বড় অন্ধকার এইদিকটা-

কণ্ঠস্বর!

চাপা কণ্ঠস্বর!

মানুষের!

বাচ্চার!

নিজের চোখদু’টোকে, অন্ধকারে যতটা সম্ভব শাণিত করে, পুটুসের ঝোপটাকে পেরিয়েই, স্তব্ধ হয়ে গেল রামদিন!-

রানি আর সোনি!

  জড়ো করা অনেকগুলো ভাঙা মালসার থেকে, পিণ্ডের আধ-কাঁচা-ভাত, কলা-তিলের-মণ্ড, শেয়ালের ধূর্ততায় লুকিয়ে, গোগ্রাসে খেয়ে চলেছে ওরা…

  শিশু পেট খিদে সহ্য করতে শেখেনি!- তাই শিশুসুলভ সরলতায়, পিণ্ডের অনায়াস আহার ভক্ষণ করতে বসে গেছে, অত্যন্ত বিচক্ষণতায়!

  রামদিনকে দেখে, মুখে ভাতের-মণ্ড নিয়ে, মেয়েদু’টো হেসে ফেলে…

  দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসে রামদিনের!

আর কিছু দেখা হয় না…

দেখতে চায়ও না!

  মাটিতে ধেবড়ে বসে, হাউহাউ করে ডুকরে কেঁদে ওঠে, পিতা রামদিন…

কলমে মৌলীনাথ গোস্বামী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here