সকালে চোখ খুলেই মোবাইল হাতড়ানো নিপার এক বদভ্যাস। আজ সকাল সকাল মোবাইল এর স্ক্রিন আনলক করতেই নজরে পড়লো অনেক গুলো মিসকল , মা আর দাদা , দুজনেরই। দাদার মিসকল নিয়ে অত মাথা ব্যাথা নেই নিপার, তাই বিছানায় শুয়েই, আগে মাকে ফোন করলো নিপা।
– ‘কি হয়েছে মা ? এতো বার ফোন করেছো যে , এই সক্কাল সক্কাল !! শরীর ভালো তো?’
– ‘হ্যাঁ, ভালো আছি, আচ্ছা, দাদা কি তোকে ফোন করেছিল?’
– ‘হ্যাঁ , ওর ও তো মিসকল দেখলাম, কিন্তু আমি তোমাকেই আগে ফোন করলাম। কি ব্যাপার বলো তো?’
– ‘একটা কথা বলি, তুই রাগ করবি না তো?’
– ‘কি?’
– ‘বলছি দাদা বলছিলো বৌ আর দুই ছেলে কে নিয়ে এখানে চলে আসবে। বাইরে অবস্থা ভালো না। সরকার নাকি লকডাউন ডাকতে পারে। আর এই কি একটা ভাইরাস নাকি খুব ভয়ঙ্কর। সব নাকি বন্ধ হবে ,তাই দাদা চাইছে, আগেই বাড়ি চলে আসবে। আমি আর বাবা একা থাকি, তাই বোধহয়। তোর দাদা তো খুব ভয় পাচ্ছিলো , কিন্তু আমি বলেছি নিপা কে না জিগেস করে আমি কিছু বলতে পারছিনা। তুই বল।.
-‘মা তুমি কি পাগল !!! তোমার কি আর কোনো দিন শিক্ষা হবে না !! এতো অপমান এতো কিছু সব ভুলে গেলে। এখন আমাকে জিগেস করছো ? তোমার যা ভালো লাগে করো, তবে আমি ‘না-ই ই ‘ বলবো।’ নিপা চেঁচিয়ে উঠলো।
– ‘আচ্ছা আচ্ছা তুই রাগ করিস না। তুই যা বলেছিস আমি সেটাই বলবো আর সেটাই করবো।’
– ‘তোমরা ছেলে আর মা সক্কাল সক্কাল এই বলতে আমাকে ফোন করেছো ? এতো সহজে সব ভোলা যাই মা ? তুমি পারো আমি পারি না। দাদা আসুক না যতবার ইচ্ছে , ওর বৌ যেন আমার বাড়িতে পা না দেয়। যে আমার মা বাবা কে সামান্য সম্মান দিতে পারে না, টাকা ছাড়া কিছু বোঝে না, সে বাড়িতে আসলে ও তোমাকে একবিন্দু দেখবে না , উল্টে তোমাকেই ঝি এর মতো খাটিয়ে নেবে।’
– ‘জানি জানি , কিন্তু দাদা বলছিলো , আমাদের এসময় একসাথে থাকা উচিত। তাই। ….’
– ‘বললাম তো যা ইচ্ছে করো। ..আমি ফোন রাখলাম।’

এই বলে ফোন কেটে দিয়ে, নিপা এক মুহূর্তে ফোন লাগলো দাদা অনির্বান কে। প্রথমবারে ফোন রিং হয়ে গেলো , আবারো ফোন করাতে দ্বিতীয়বারে ফোন ধরলো অনির্বান।

– ‘হ্যাঁ বল।’ বললো অনির্বান।
– ‘কি বলবো , তুই বল , তুই তো ফোন করেছিলি সকাল সকাল।’ নিপা একটু উঁচু স্বরে বলে উঠলো।
– ‘হ্যাঁ , বলছিলাম কি , আমি, জয়া আর টাবু -বাবু কে নিয়ে বাড়িতে চলে যাবো ভাবছি। কলকাতার অবস্থা খুব খারাপ।’
– ‘আর তোর অফিস?’
– ‘হ্যাঁ, সেটাও ভাবছি। দেখি। আজ বললে তো আজ যাচ্ছিনা , অফিস কবে বন্ধ হয় , কবে লকডাউন শুরু হবে দেখা যাক। সব তো কানাঘুষো চলছে’
– ‘না যাবি না’ – বললো নিপা। ‘তুই যাবি যা , তোর ওই বৌ যাবে না। মনে নেই তার কীর্তিকলাপ, ক্ষমা চাইলি, আবার ভুলে গেলি এতো সহজে, এতো তাড়াতাড়ি। নাকি সুযোগ খুজঁছিলি ?’
– ‘বাজে বকিসনা। খুব বেশি আস্পর্ধা হয়ে যাচ্ছে তোর নিপা। কি ভাবে বড় দাদার সাথে কথা বলতে হয় ভুলে গেছিস।’
– ‘হ্যাঁ, আমার মা- বাবা কে কেউ অসম্মান করলে আমি খুব সহজে সব ভুলে যায়। শুধু তো মা বাবা নয় , আমাকে ,আমার ছোট্ট ছেলে, আমার বরকে, সবাইকে তোর ওই বৌ সামান্য ভালোবাসা তো দূর, নূন্যতম সম্মান দেয়নি। বোনের মতো যত্ন করে আমি ঘরে এনে ছিলাম ওকে। আর তার কি পুরস্কার দিলো সে?’ বিশ্বাসঘাতক।’
– অনির্বান চেঁচিয়ে উঠলো -‘অনেক হয়েছে নিপা, তোর মা বাবা কে, এরপর কিছু হলে তুই দেখে নিস্, আমাকে আর কিছু বলবি না।’ এই বলে ফোন কেটে দিলো অনির্বান।

‘তোর মা বাবাকে কে তুই দেখে নিস্ ‘?? অনেকক্ষণ, মাথার মধ্যে ঝাঁ ঝাঁ করছিলো কথাটা। বিছানা ছেড়ে উঠে আসতে পারছিলো না নিপা। কেমন বোবা হয়ে গেলো , আর দু চোখ দিয়ে ঝরে যেতে লাগলো জল। খুব আপন কিছু হারিয়ে যাওয়ার বা .. দমকা হাওয়ায় কে যেন কিছু একটা নিয়ে পালিয়ে গেলো, কি বলবে কি করবে বুঝে পেলো না।
শোভন , নিপার বর বার বার জিগেস করলো। কি হয়েছে !!! কি কথা হলো এতো সকালে। কিছু তো বলবে ?
নিপা সব খুলে বললো শোভনকে। শোভন বললো-‘ও কিছু না , তোমার দাদা রেগে এসব বলেছে , তুমি অত ভেবো না , সব ঠিক হয়ে যাবে।’
রান্না ঘরে ঢুকে দিনের কাজ শুরু করলো নিপা। কিছুক্ষন পরে আবার মা এর ফোন।
– ‘হ্যাঁ মা বোলো।’
– ‘কিরে !!’
– ‘হ্যাঁ , দাদা কে আমি না বলে দিয়েছি।’
– ‘আচ্ছা , ঠিক আছে।’
উদাসীন ভাবে মা যেন ফোনটা রেখে দিলো। নিপা বুঝলো , মা দুঃখ পেয়েছে। হাজার হোক মা তো। মা-রা নিজের সন্তান এর সব ভুল মাফ করে দেয়। নিপা , তার মা কে , তার দাদার ওই কড়া কথাগুলো আর বলে উঠতে পারলো না।

কাজ কর্ম সেরে সকাল থেকে দুপুর গড়িয়ে রাত হয়ে গেলো কখন। স্বামী-ছেলে নিয়ে তথাকথিত সুখের সংসার নিপার, কলকাতা থেকে অনেকটা দূরে এখন চেন্নাই এর বাসিন্দা। শোভন এখানে আই আই টির প্রফেসর। কদিন ধরে করোনা-করোনা নাম আর তার আতঙ্কে বিদেশে হাহাকারের কথা কানে আসছিলো নিপার। চেন্নাই বা কলকাতা কেন এখন ভারতে সেভাবে করোনার কেস ধরা পড়েনি। ভেবেছিলো ছেলের স্কুলের পরীক্ষার পর বাড়ি যাবে। কিন্তু একটা অজানা ভয়ে আর টিকিট কাটেনি নিপা আর শোভন । মা র কাছে তাই যাওয়া হয়ে উঠলো না এবার।
দুদিন আগে সরকার সংবাদ মাধ্যমে বলছিলো এবার আমাদের দেশেও লকডাউন করবে নইলে ইতালি-আমেরিকার মতো নাকি আমাদের দেশেও একই হাল হবে।
কে জানে , কি হবে। এসব হাজারো কথা ভাবতে ভাবতে চোখ লেগে এসেছিলো নিপার। কিন্তু দু মিনিটে বুকটা ধড়ফড় করে উঠে বসলো। মোবাইল চেক করে দেখলো রাত ১২.২০. ছেলে আর শোভন দুজনেই ঘুমে কাতর। নিপার ঘুম আসছে না। ভাবতে লাগলো , মা বাবা আগে না তাদের সম্মান!! আজ যদি মা বা বাবার কিছু হয়ে যায় , তাহলে নিজের মুখ কি নিজে দেখতে পারবে সে !!! নিজের মান সম্মান এক মিনিটে ধুলিস্মাৎ হয়ে গেলো। খুব কান্না পাচ্ছিলো নিপার। দাদা , মা-বাবার কাছে গিয়ে থাকলে , মা বাবা কে দেখার কেউ থাকবে। নিজেকে খুব স্বার্থপর মনে হচ্ছিলো।কেন সে এতটা স্বার্থপর হয়ে গেলো! কেন একবারে রাজি হলো না সে!
রাত কখন ধীরে ধীরে ভোর হয়ে গেলো , আর নিপার চোখ কখন ভারী হয়ে এলো নিপা বুঝে উঠতে পারলো না।

সকাল সকাল উঠে মা কে ফোন করে জিগেস করলো নিপা ,
– ‘মা তুমি কি চাও !!! দাদা আর জয়া বাড়ি আসুক !!!’
– ‘না না , আমি কিছু চাই না , আমি চাই তুই ভালো থাক, তোরা ভালো থাক।আমি আর তোর বাবা ভালো আছি , আমাদের নিয়ে তোরা ভাবিস না।’ ওদিক থেকে মা বলে উঠলো। আরো অন্য প্রসঙ্গের কিছু কথা বলে ফোন রেখে দিনের কাজে মন দিলো নিপা।

দুপুরে সব কাজ সেরে অনির্বান কে ফোন লাগলো নিপা।
– ‘হ্যাঁ , কি হয়েছে ?’ অনির্বানের কর্কশ স্বরে ঝাঁঝিয়ে উঠলো নিপার কান। তাও নিজেকে সামলে নিলো। বললো
– ‘কবে থেকে লকডাউন হবে দাদা ?’
– ‘পরশু , সোমবার থেকে মনে হয়।’
-‘তোর অফিস ?’
– ‘হ্যাঁ , আজ ও তো যাচ্ছি , আজি হয়তো শেষ যাবো , ঠিক নেই , কেন? বাড়ি থেকেই কাজ হবে মনে হয়।’
– ‘না , তুই. জয়া আর ছেলেদের নিয়ে বাড়ি চলে যা। আমি বলছি। আমার কোনো আপত্তি নেই। আমার মান -সম্মান পরে নয় হবে, তুই মা-বাবার কাছে গিয়ে থাক।তোর অফিস বাড়ি থেকে করবি নয় , আর তো ঝামেলা নেই।’
কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে অনির্বান বলে উঠলো –
– ‘সেকি !!! এখন আর সে কথা বলে কি হবে ? এখন আর যাওয়া যাবে না।’
-‘কেন ? এখন আর কেন যাওয়া যাবে না ? তুই তো কাল সকালেও বললি মা র কাছে যেতে হবে। আজ দেড় দিনে কি এমন পাল্টে গেলো। লকডাউনও তো হয়নি। আর যা সমস্যা ছিল তা ছিল আমার থেকে মত পাওয়া। আমি তো মত দিচ্ছি। কেন যেতে পারবি না এখন?’
– ‘না… আর যাওয়া সম্ভব না। এখন পরিস্থিতি ঠিক না। ছেলে বৌ কে নিয়ে রাস্তায় বেরোনো খুব চাপের। থাক মা বাবা যেমন আছে থাক। ওরা নিজেদের সামলে নেবে।’
কাল অনির্বানের কথাগুলো বিশ্বাস করতে পারেনি। নিপা তার একমাত্র প্রিয় দাদার মুখ দিয়ে এরকম কথা আগে কোনোদিন শুনেছিলো না, তাই বোধহয়। আর আজ , আজ এ কি রূপ দাদার!! কাল সব দোষ নিপার ওপরে চাপিয়ে দিয়ে আজ এমন ভাব দেখাচ্ছে যেন এরকম কোনো কথায় হয়নি। ফোন রেখে দিলো নিপা , অনির্বানকে বুঝতে দিলো না , নিপা কাল কি হারিয়েছিল আর আজ কি হারালো।
মা কে ফোন করে নিপা সব কথা বললো। বললো
– ‘মা আমি তোমার -বাবার- নিজের মান- সম্মান-অভিমান সব কিছুকে ভাসিয়ে দিয়ে দাদাকে হ্যাঁ বলেছি।’
– ‘কি বললো দাদা !! কবে আসছে ওরা ?’ মা জিগেস করলো।
– ‘ওরা আসবে না মা।’
– ‘আমি জানতাম নিপা। আমি সব জানতাম।’ ফোনের ওপার থেকে ভাঙা গলা ভেসে আসলো।
নিপার বুকটা কেমন চিনচিন করছিলো মা এর কথায়। স্পষ্ট যেন মা এর মুখটা দেখতে পারছিলো নিপা। মা যেন কান্না চেপে নিপা কে বললো
– ‘নিপা , তোর মা সব বোঝে , শুধু প্রকাশ করে না। তুই বড় বোকা। অনির্বান তোর কাঁধে বন্ধুক রেখে চালাতে চেয়েছিলো, ও ভাবতে পারেনি আমার জেদি মেয়ে নিপা, তার মা- বাবার জন্য তার জেদ ও জলাঞ্জলি দেবে। ও বুঝতে পারেনি। ওর এবারের চালটা ভুল হয়ে গেছে।’
– ‘মা তুমি মন খারাপ করো না, আমি তো আছি মা, আমি তো আছি ,লকডাউন শেষ হলেই আমি আর শোভন তোমাকে আমার কাছে নিয়ে আসবো। দেখো। মা তুমি কেঁদো না মা। আমি আছি।

ফোন রেখে দিয়ে, দুদিকে, দুই শহরে মা আর তার আত্মজা চোখের জলে নিমজ্জিত হলো। আর অপেক্ষায় থাকলো কবে আবার দেখা হবে।

কলমে মৌসুমী কুন্ডু

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here