ঘন অন্ধকারের মধ্যে বাড়ির পিছনের সিঁড়ি দিয়ে খুবই সতর্ক ভাবে মারিয়াম নিচে নেমে আসে  । আসার সময় নাইট গাউনে একটু টান অনুভব করেছিল , পিছন ফিরে  তাকানোর মতো অবকাশ পায়নি  । হাতের ব্যাগটা যেমন করেই হোক খুব সন্তর্পণে আরিয়ানের হাতে তুলে দিতে হবে । আরিয়ান দুবার কোকিলের ডাক ডেকেছে এই নভেম্বর মাসে । এরপর অধৈর্য হয়ে আর একবার ডেকে উঠলে বাবা জেগে যেতে পারেন  । সেই আশঙ্কায় মারিয়াম দ্রুত পা চালায় ।

মারিয়ামকে বাড়ির পিছনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে  আরিয়ান গেট টপকে ভিতরে চলে আসে । পিছন দিকের বাগানে একসাথে তিনটে শিশু গাছ জায়গাটাকে আরো অন্ধকার করে তুলেছে । গাছগুলির উচ্চতা অনেক , গাছের মোটা কান্ড গুলিও বেশ প্রশস্ত । আরিয়ান বাগানে ঢুকে গাছ গুলির পিছনে চলে যায় । শুকনো পাতার উপর খড়খড়ে শব্দ করে  মারিয়াম উদভ্রান্তের মতো দ্রুতপদে এগিয়ে আসছে । শিশুগাছগুলির কাছে আসতেই আরিয়ান খপ করে মারিয়ামের হাতটা ধরে গাছ গুলোর পিছনে টেনে আনে । অন্ধকারে আরিয়ানের উপস্থিতি ও শরীরের গন্ধ চিনতে পেরেই মারিয়াম হাত থেকে ব্যাগটা ফেলে আরিয়ানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ে । আরিয়ান তাঁর  বলিষ্ঠ বাহুডোরে মারিয়ামকে বুকের নিভৃতে বড় যত্নে আবিষ্ট করে ফ্যালে  । প্রায় কিছুক্ষণ সময় তারা সব ভুলে আলিঙ্গনবদ্ধ ছিল। এবার আরিয়ান বাহুদ্বয় শিথিল করে ধীরে ধীরে ডান হাত দিয়ে মারিয়ামের চিবুকটা উঁচু করে ধরে কপালে একটা চুম্বন এঁকে দেয় । তখনও আরিয়ানের উষ্ণ ঠোঁট মারিয়ামের কপাল ছুঁয়ে ছিল — ‘ আর কয়েকটা ঘন্টা , তারপর মারিয়াম আমরা আকাশে পাড়ি দেব , পৌঁছে যাব কানাডার শহরে । আমার দিদি জেসিকাকে আমি টেলিগ্রাম করে দিয়েছি । আমার থিয়েটারে প্রম্পটারে চাকরী পাকা , সকালে আমি একটা স্কুলে শিক্ষকতা করবো  । তুমি ঘরে থাকবে । সন্ধ্যা হলে তুমি আমার সাথে থিয়েটারে যাবে সেখানে তুমি পিয়ানো বাজাবে । আমরা আস্তে আস্তে টাকা জমিয়ে ওইখানে ব্যবসা শুরু করবো । আমাদের একটা ছোট্ট সংসার হবে । একটা ছোট কাঠের বাড়িতে আমরা থাকবো । আমাদের স্বপ্ন ধীরে ধীরে বাস্তবায়িত হবে । তুমি খালি আমার পাশে থেকো , আমার উপর ভরসা রেখো । ‘

–‘ আরিয়ান আমি নিজের থেকেও তোমাকে বিশ্বাস করি ।  আমি সব ছাড়তে পারি কিন্তু তোমাকে ছাড়ার কথা আমি স্বপ্নেও ভাবলে ভয়ে কেঁদে উঠি । তোমার উপর ভরসা টুকুই আমার অহংকার । ‘

–‘ আচ্ছা বলো তুমি এতো রাত্রে কেন ডেকেছো ? আর তুমি হাতে করে কি নিয়ে এলে ?

— ‘ ব্যাগ , এতে আমার জামা, গয়না যা আমার মা আমার জন্য রেখে গিয়েছিলেন । আর দশ হাজার টাকা যা আমাদের  পরে  কাজে লাগবে । তুমি যদি বলো আমি আরো আনতে পারি ‘

— ‘ মারিয়াম তুমি করেছোটা কি ? আমি শুধুমাত্র তোমাকে নিয়ে যেতে চাই । টাকা গয়না সঙ্গে নিয়ে গেলে  আমাদের  চোরের দুর্নাম নিতে হবে ।  না না এসব কখনই আমি নিতে পারবো না ! । জামা থাক তুমি টাকা গয়না ফিরিয়ে নিয়ে যাও । আমার সাথে যেতে হলে খালি হাতে যেতে হবে । ‘

— ‘ ঠিক আছে তাই হবে । শুধুমাত্র মায়ের গলার চেনটা আমার কাছে রাখতে দাও , মায়ের স্মৃতি হিসাবে । আমরাতো এই দেশে আর ফিরছি না আরিয়ান । আমি মাকে খুব ভালবাসি , মায়ের অভাব বোধ করি সব সময় । মা বেঁচে থাকলে এইভাবে চোরের মতো পালিয়ে বিয়ে করতে হতো না । মা ঠিক বাবাকে বোঝাতেন । ‘

— ‘ ঠিক আছে তুমি এখন ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ো । কাল সকাল সকাল বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসো । আমি সব ব্যবস্থা করে রেখেছি চার্চে বিয়েটা সেরেই আমরা বাস টার্মিনালে চলে যাব । তুমি কাল শুধুমাত্র মিউজিক ক্লাসে যে ব্যাগটা নিয়ে যাও সেটাই সঙ্গে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরোবে , যাতে কেউ সন্দেহ না করে । চলো এখন ফিরে যাও বলেই আরিয়ান মারিয়ামের গালে হাত দিয়ে স্নেহের স্পর্শ করে ।

মারিয়াম ব্যাগ থেকে একটা স্কার্ফ বের করে তাতে গয়না ও টাকা গুলো রাখে এবং পুটলি করে বাড়ির দিকে হাঁটা লাগায় । কি মনে হলো তার একবার সে পিছন ফিরে তাকায় , দেখতে পায় আরিয়ানের দাঁড়ানোর স্থানটি কেমন যেন ভয়ানক অন্ধকারাছন্ন হয়ে উঠেছে । আরিয়ান আবছা ভাবে  দৃশ্যমান । সেটা দেখে মারিয়ামের বুকটা চিন চিন করে ওঠে  । কালই সকালে দেখা হবে অথচ এইটুকু সময়ের ব্যবধানেও বুকের ভিতর কেমন যেন করছে । মারিয়াম সিঁড়ি দিয়ে উঠে এসে বাবার ঘরে ঢোকে বিছানার পাশে গ্রামোফোন রাখার শ্বেতপাথরের টেবিলে পুটলিটা সন্তর্পণে রেখে নিজের ঘরে ফিরে আসে । ঘরে ফিরে এসে দ্যাখে লিয়েনা আপাদমস্তক চাদর  ঢেকে ঘুমোচ্ছে । যাক লিয়েনা  টের পায়নি এই ভেবে মারিয়াম বিছানার পাশে রাখা কর্ণার টেবিল থেকে ঢাকা দেওয়া দুধের গ্লাসটা সন্তর্পণে তুলে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে শেষ করে বিছানায় শুয়ে পড়ে । একরাস স্বপ্ন চোখের পাতার উপর নেমে আসে , হয়তো কাল সকালে রবির স্বর্ণালী আলোক ছটায় মারিয়ামের জীবন উদ্ভাসিত হবে । নিজের ভালোবাসাকে একেবারে নিজের করে পাওয়ার মধ্যে যে সার্থকতা তা শুধু ভালবাসার মানুষই উপলব্ধি করতে পারে । সেই স্কুল থেকে মারিয়াম আরিয়ানকে বন্ধুর অতিরিক্ত ভেবে এসেছে । স্কুলের গণ্ডি শেষ করার আগেই দুজনেই একে অপরের কাছে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হয়েছিল  । তারপরও কেটে গেছে আটটা বছর , সম্পর্ক আরও দৃঢ় হয়েছে । মারিয়ামের বাবা আলবার্ট গেরিন জানতে পেরে যান এই সম্পর্কের কথা। তার ফলস্বরূপ মারিয়ামের উপর শাষণ বেড়ে যায় । বাবাকে প্রত্যক্ষ সমর্থন করে লিয়েনা , মারিয়ামের যমজ বোন। মারিয়ামের গতিবিধির উপর সর্বদা কড়া নজর ছিল তাঁর  । কারণ তাঁর  অভিসন্ধি ছিল অন্য । মিঃ আলবার্ট আরিয়ান ও তার বাবা মাইকেল গোমসকে প্রাণ নাশের হুমকিও দিয়েছিলেন । সব রাস্তা যখন বন্ধ হয়ে যায় আরিয়ান ও মারিয়াম পালিয়ে বিয়ে করে গোয়া ছেড়ে এমনকি দেশ ছেড়ে যাবার পরিকল্পনা করে । আরিয়ানের দিদি কানাডায় থাকে , সেখানে যাবার মনস্থ করে তারা ।

( 2 )

দুর্ভাগ্যের পরিহাস , কখনও কখনও স্বপ্ন বাস্তবের রূপ পায়না । ঈশ্বরের মতিগতির উপর আজ পর্যন্ত কারোরই নজরদারি করা সম্ভব হয়নি । ভাবনা ইচ্ছে এই সকল অনুভূতি বড়ই বিচিত্র । মনের প্রতিটা রন্ধ্র , কোষ জালিকাকে এমনি আবিষ্ট করে রাখে যে মানুষ সুখস্বপ্নে বিভোর থাকে । তারপর যখন নিদ্রা ভঙ্গ হয় তখন আস্ফালনের অবকাশ পায় না । সেদিনের সকালটা শুরু হয়েছিল সেই ভাবে । সকালটা সকাল ছিলনা । সূর্য ছিল মধ্য গগনে । মারিয়ামের যখন ঘুম ভাঙ্গে সূর্যের তির্যক আলো জানালার মোটা পর্দা ভেদ করে ঘরে প্রবেশ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করছে । মারিয়াম উঠে বসে , মাথাটা প্রচন্ড ভার ভার লাগছে  । চোখের পাতায় তখনও জড়তা কাটেনি । কপাল ধরে বসে থাকে । বিছানার সামনে দেয়ালে পেন্ডুলামের ঘড়িতে ঢং করে একটা ঘন্টা পড়ে । আওয়াজ শুনে মারিয়ামের আচ্ছন্ন ভাবটা কিছুটা কাটে । চোখ তুলে দ্যাখে ঘড়িতে একটা বাজে । সে জানালার বাইরে প্রখর রৌদ্রের সাথে ঘড়িতে বাজা একটার যোগসূত্র বের করতে পারছে না । কিছুতেই তাঁর  মস্তিস্ককের সরল ভাবনায় আসছে না যে এখন দুপুর একটা বাজে । স্তম্ভিত ফিরতে সময় লাগে । মারিয়াম বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায় , পা ঈষৎ টলমল করছে তখনও । হৃৎপিণ্ডের ধুক্পুকানি ঘড়ির কাঁটা দেখে বন্ধ হবার জোগাড় । এতোটা বেলা হয়ে গেছে  দেখে  সে আতঙ্কিত  । সকাল সাড়ে আটটার মধ্যে চার্চে পৌঁছে যাবার কথা ছিল। সেখানে বিয়ের সমস্ত ব্যাপার আগে থাকতেই আরিয়ান বন্ধুদের নিয়ে ব্যবস্থা করে রেখেছিল । সেখানে বিয়ে সেরেই আরিয়ানের বন্ধুরা গাড়ি করে গোয়া বাস টার্মিন্যালে ছেড়ে আসবে , বেলা দেড়টায় বাস বোম্বের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেবে । পরের দিন ভোরে বম্বে থেকে প্লেন । সব কিছু পরপর ভাবতেই মারিয়াম আরো আতঙ্কিত হয়ে ওঠে । কোন রকমে বাথরুম থেকে পরিছন্ন হয়ে আসে । কিছুতেই খুঁজে পায় না আজ সকালে যে ম্যাক্সিটা পরে বেরোবে ঠিক করেছিল । নিজের ভাল ভাল জামা সবই কাল ব্যাগে করে আরিয়ানের হাতে দিয়ে এসেছে । বাধ্য হয়ে লিয়েনার আলমারীতে হাত দেয় । লিয়েনার গোলাপী রঙের বেলবটম বের করে পরে নেয় । মিউজিক ক্লাসের ব্যাগটাও খুঁজে পাচ্ছে না । সমস্ত ছোট খাটো জরুরী জিনিস পত্র ঐ ব্যাগে মনে করে গুছিয়ে রেখে ছিল । কিছুতেই খুঁজে পেলনা । আর হাতে সময় নেই দোতলা থেকে নেমে আসে মারিয়াম । বাড়িতে এখন কেউ নেই ! বাবা পেপার মিলে গেছেন । কিন্তু লিয়েনা কোথায় ? বাগানের ফিয়েট গাড়িটাকে দেখে একটু যেন আশ্বস্ত হল । আবার ঘরে ঢুকে বাবার ঘরের ড্রয়ার থেকে চাবি নিয়ে আসে । মালী বাগানে কাজ করছিল ,   তাকে দেখে মারিয়াম জিজ্ঞাসা করে –‘ তুমি কি দেখেছো বাবা কি আজ  ম্যানেজারের গাড়িতে অফিস গেছেন  ?

–‘হ্যাঁ , উনি  ম্যানেজারের সাথে  গেছেন ।

— ‘ লিয়েনা কখন বেরিয়েছে জানো তুমি ?

–‘ কি বলছো তুমি ? তুমিতো লিয়েনা ! মারিয়াম খুব সকালে বেরিয়ে গেছে ।

মারিয়াম মালীর উক্তি শুনে মনে মনে ভাবলো লিয়েনার পোষাক পরেছি বলে আমাকে লিয়েনা ভেবে ভুল  করছে । যাইহোক …। মারিয়াম ফিয়েট নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যায় । ভরদুপুরে রাস্তায় লোক কমে এসেছে । মারিয়াম গাড়ির স্পিড বাড়ায় । চার্চের সামনে এসে গাড়ি পার্ক করে চার্চের ভিতর ছুটে যায় । চার্চের ভিতর কোন মানুষের চিহ্নটি পর্যন্ত নেই , শুনশান করছে চারদিক । মারিয়াম দিশেহারা হয়ে পড়ে । কি ভেবেছিল আর হতে চলেছে ! মনের উপর অমানবিক চাপে বিধস্ত মারিয়াম কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে । ফাঁকা হলঘরে কান্নার আওয়াজ দেয়ালে ধাক্কা খেয়ে ফিরে আসছে পুনরায় । প্রার্থনাকক্ষের দরজা সরিয়ে ফাদার ভিতরে ঢোকেন — ‘ লিয়েনা তুমি এখন এখানে বসে কি করছো ? তুমি কাঁদছো কেন ? বিয়ের সময় তোমাকে দেখলাম না কেন ?

মারিয়াম চিৎকার করে ওঠে — ‘ আমি লিয়েনা নই ফাদার ! আমি মারিয়াম ! লিয়েনা আমার সর্বনাশ করে দিয়েছে । আরিয়ানের বিয়ে হয়ে গেছে ফাদার ?

— ‘ সেতো সকাল নটায় হয়ে গেছে , খুবই আড়ম্বরহীন ভাবে । কিন্তু কনে তো মারিয়াম ছিল ! তোমাদের বাড়ি থেকে কেউ আসেনি ।

— ‘ না ফাদার … না , আমি মারিয়াম , ও ছিল লিয়েনা ….. মারিয়াম কাঁদতে কাঁদতে প্রার্থনাকক্ষ থেকে টলমল পায়ে বেরিয়ে যায় । সোজা গাড়িতে ওঠে । দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে গোয়া বাসটার্মিনালে রওনা দেয় । পোন্ডা থেকে গোয়া বাসটার্মিনাল খুব স্পিডে গেলেও সাড়ে তিন ঘণ্টার পথ । কি করে হবে ! ! বাসতো ছেড়ে দেবার কথা দেড়টায় । এখন পৌনে দুটো বাজে । তবুও বিধস্ত মারিয়াম জোরে গাড়ি চালায় । চড়াই উতরাই রুক্ষ পাথুরে পথ । রাস্তা ঘাট ভালো করে এখনও তৈরী হয়নি এদিকে । ধূলোয় ভরা রুক্ষ রাস্তার বাঁকে বাঁকে নতুন  ফিয়েট  ধূলোর ঝড় উড়িয়ে  চলেছে । দিশেহারা মারিয়াম গাড়ির স্পিড একশোতে তুলেছে ফেলেছে । গাড়ির উইন্ড স্ক্রিনে পুরু ধূলোর আস্তরণ পড়েছে । সামনের দৃশ্যমান সব কিছু ঝাপসা হয়ে উঠেছে । খুব দূরে কিছুই প্রায় দেখা যাচ্ছে না । হটাৎ একটি মাছ বোঝাই লরি সামনে এসে পড়ে । মারিয়াম স্পিড ব্রেক করতে গিয়ে ভারসাম্য হারিয়ে ফ্যালে  । গতি আর নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে লরির কানা ঘেঁসে বেরিয়ে গিয়ে খাড়াই রাস্তার ধারে নারিকেল গাছের সারিতে সজোরে ধাক্কা । গাড়ির দরজা খুলে মারিয়াম ছিটকে পড়ে যায় । খাড়াই রাস্তার দুধারে পাথুরে ঢাল কাঁটাঝোঁপে ভর্তি । মারিয়াম পাথুরের ঢালে  রুক্ষ পাথরে আর কাঁটাতে ঘষটাতে ঘষটাতে গড়িয়ে কঠিন পাথরের চাতালে চিৎ হয়ে পড়ে । সর্বাঙ্গ কেটে ছড়ে ফালা ফালা , মাথাটার পিছনটা কঠিন পাথরে পড়ে থেঁতলে গেছে । মারিয়াম চোখ খোলার খুব চেষ্টা করে একবার খোলা আকাশটার দিকে তাকায় তারপর চিরতরে চোখ বন্ধ হয়ে যায় । রক্তে ভেসে যাওয়া পাথরের চাতালে মারিয়ামের নিথর দেহটা পড়ে থাকে । এক লহমায় শেষ হয়ে যায় ভালবাসার মানুষটির সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে বেঁচে থাকার  আর্তি ।

(  ৩ )

প্লেনের সিটে বসে আরিয়ান যেন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফ্যালে –‘ যদিও অনেকটা সময় প্লেনে থাকতে হবে তবুও একবার আকাশে পাড়ি দিতে পারলে নিশ্চিন্ত আমাদের স্বপ্নের ভূমিতে পৌঁছে যাব । কি বলো মারিয়াম ? একি ! তুমি এখনও সানগ্লাস পড়ে আছো কেন  ? তোমাকে তো বোম্বের ফ্লিমস্টার বলে ভুল  করতে পারে লোকে ! ‘
আরিয়ানের কথা শুনে মৃদু হাসে মারিয়ামরুপী লিয়েনা । আরিয়ান আবারও বলে– ‘ কাল থেকে আমার নতুন বিয়ে করা বৌকে একবারও ভালো করে দেখলাম না । বিয়ের গ্রাউনে তোমাকে ভাল লাগছিল । কিন্তু ওড়নায় মুখটা বেশি ঢেকে ফেলেছিলে । সেই কাল সকালে  বিয়ের গাউন বদলে ড্রেস পড়েছো , সেই থেকে মাথায় স্কার্ফ জড়িয়ে রেখেছো যে আমি তোমাকে ভালো করে দেখতেই পারছি না । আমার তোমার লম্বা খোলা চুলই বেশি ভালো লাগে । আজ বড্ড চড়া সেন্ট ব্যবহার করেছো তুমি । তোমার গায়ের মিষ্টি গন্ধটা ঢাকা পড়ে গেছে । ‘

–‘ এখন থাকনা আরিয়ান । দিদির বাড়ি পৌঁছে না হয় আমাকে ভাল করে দেখো । আসলে আমার খুব ভয় করছে । নতুন জায়গায় যাচ্ছি । বাবা লিয়েনার কথা মনে পড়ছে । ‘

—‘ওই বদমেজাজী পাগলী লিয়েনাকে ভুলে যাও । ও একটা হিংসুটে মেয়ে । যমজ বোন বলে হুবহু এক দেখতে তোমাদের কিন্তু স্বভাব চরিত্র একদম ভিন্ন । ও কখনও তোমার ভাল দেখতে পারেনি । দেখো আমার দিদিকে , কানাডায় আমাদের জন্য সবরকম ব্যবস্থা করে রেখেছে । আর তোমার বোন লিয়েনা সব সময় তোমাকে অপদস্ত  করেছে অথচ আমার সাথে ভাল করে কথা বলে  । তুমি যাই বলো মারিয়াম আমার ওর অভিসন্ধি নিয়ে বরাবরই সন্দেহ হয় । ‘
আরিয়ানের স্বগোক্তি শুনে মারিয়ামের বেশধারী লিয়েনা নিশ্চুপ রয়ে যায় । ঘুমিয়ে পড়ার ভান করে আরিয়ানের পাশ থেকে মুখ সরিয়ে এক পাশে সরে যায় ।
আরিয়ান একটু অবাক হয়ে যায় । কারণ এখনও পর্যন্ত মারিয়াম যখনই আরিয়ানের সাথে সময় কাটিয়েছে তখনই সে আরিয়ানের হাতটি জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে পাশে বসে থাকতো । আজ বিয়ে হয়ে যাবার পর মারিয়াম দূরত্ব বজায় রাখছে দেখে আরিয়ান একটু অবাক হয় ।

( ৪ )

পরের দিন সন্ধ্যায় লন্ডন হয়ে নিউইয়র্ক পৌঁছালে ওরা প্রচন্ড দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ার সম্মুখীন হয় । আরিয়ানের দিদির স্বামী  ম্যাগলান রবার্ট  এয়ারপোর্টে নিতে আসেন । সেখান থেকে টরেন্ট তারা রেলপথে যাত্রা করে । সর্বত্র দুর্যোগের প্রাদুর্ভাব । হৈম্য শীতল আবহাওয়ার দরুন যাত্রায় প্রচুর সময়ের অপচয় হাওয়াতে তারা প্রায় দেড়দিন বাদে আরিয়ানের দিদি জেসিকার বাড়ি পৌঁছায়,  তখন সন্ধ্যে নেমে এসেছে । সেখানে গিয়ে জানতে পারে দুর্যোগের কারণে গত দুদিন ধরে ওই অঞ্চলটিতে ইলেকট্রিক সরবারহ বিছিন্ন । জেসিকা হাতে করে একটা মোটা মোমবাতি নিয়ে আসেন এবং আরিয়ান ও মারিয়ামকে অভ্যর্থনা জানায় । মারিয়ামবেশী লিয়েনা  পথের ক্লান্তিতে ও ঠান্ডায় ম্রিয়মাণ হয়ে গেছে । খাদ্য পানীয় গ্রহণ করে ওরা জেসিকার সম্মতি নিয়ে নিজেদের শোয়ার ঘরে প্রবেশ করে  । জানালা দরজা আঁটা বদ্ধ ঘরটি অন্ধকারময় । বাইরে তখনও বাতাস শন শন করে বইছে , দুরন্ত হাওয়া বারে বারে কাঁচের জানালায় ধাক্কা মারছে । বিদ্যুতের আলো মাঝে মাঝে ঘরটিকে এক লহমায় উদ্ভাসিত করছে । আবহাওয়া যতই প্রতিকূল হোক না কেন আরিয়ান আজ এই রাতটির জন্য অপেক্ষা করেছিল। এর আগে তিনদিন যাত্রায় কেটে গেছে । মারিয়ামকে নিজের করে পাওয়া হয়নি । তাই ঘরে ঢুকতেই আরিয়ান অন্ধকার বিছানায় মায়াবী রাতের হাতছানি অনুভব করে । বিছানা থেকে অনেকটাই দুরে একটা নিচু কাঠের টেবিলে তেলের ল্যাম্পটা রাখা থাকলেও বিছানার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মারিয়ামবেশী লিয়েনার উর্দ্ধঅংশ ছিল একেবারে অন্ধকারাচ্ছন্ন । লিয়েনা এক এক করে মাথাঢাকা ফারের কোট , মাথার স্কার্ফ খুলে চেয়ারে রাখছে । বাইরের জামা ছেড়ে রাত্রিকালীন পোষাক পরে  বিছানায় বিশ্রামের জন্য উদ্যোগী হবে সেই মুহূর্তে আরিয়ান মারিয়ামবেশী লিয়েনাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে , তারপর লিয়েনার কাঁধে গলার পিছনে একের পর এক চুম্বন দিতে থাকে । আবেগঘন  লিয়েনা আরিয়ানের বুকের উপর নিজেকে উজাড় করে দেয় । আরিয়ান লিয়েনাকে বাহুডোরে তুলে বিছানায় শুয়ে দেয় । নবদম্পতি যুগল ভেসে যায় যৌবনের ভরা কোটালে । মায়াবী রাতের মাধুর্যতা আছড়ে পড়ে নরম বিছানায় । নব বিবাহের উত্তেজনায় আরিয়ান আলোকহীন রাতে কী নির্মম ভাবে প্রতারিত হয়েছে তা কেবল ঈশ্বরই জানেন । লিয়েনা আজ  রাতের ঐ মুহুর্তক্ষণের অপেক্ষায় ছিল । লিয়েনা ভেবেছিল মারিয়ামের রূপের সাথে যখন তার বিন্দুমাত্র পার্থক্য নেই তখন আরিয়ানকে বশীভূত করা বড়ই সহজ হবে । সেই স্কুলজীবন থেকে ক্লাসের মধ্যে আরিয়ানকে বেশী ভাল লাগতো , কিন্তু আরিয়ান তাকে এড়িয়ে যেত । মারিয়ামের মিষ্টি স্বভাব , বন্ধুসুলভ আন্তরিকতা অনেক বেশী মন কাড়তো আরিয়ানের । লিয়েনার স্বভাব ছিল বদমেজাজী । চোখে মুখে ছিল ভনিতা আর স্বার্থপরতা । সেটাই আরিয়ানকে লিয়েনার প্রতি কখনও নমনীয় হতে দেয়নি । যত বড় হয়েছে লিয়েনা মনে মনে আরিয়ানের সুঠাম বলিষ্ট পুরুষালী দেহকে কামনা করে এসেছে । এ ভালোলাগা ছিল শুধুমাত্রই আরিয়ানের সৌন্দর্যকে ঘিরে , মনের খোঁজ কোনদিনই নিতে চায়নি লিয়েনা । কিন্তু যা সত্য তা চিরকালই সত্য থেকে যাবে । ছল চাতুরির আশ্রয় নিয়ে সত্যকে ঢাকা যায় না । যমজ বলে হুবহু এক দেখতে হলেও কিছুটা ছিল ভিন্ন । মারিয়ামের ছিল রেশমের মতো লম্বা চুল , সবসময় থাকতো খোলা । আর ছিল টানা চিকন জোড়া ভ্রু । যেন শিল্পীর নিপুণ তুলিতে আঁকা । মারিয়ামের সাবলীল মাধুর্য অনেক বেশী আকর্ষণীয় ছিল আরিয়ানের কাছে । এর বিপরীতটাই ছিল লিয়েনা । সাবেকি ফ্যাশনে চুল ছোট করে কাটা , সবসময় মেকআপের আধিক্য ছিল চোখে পড়ার মতো । ছিলনা জোড়া ভ্রু । এই পার্থক্য লিয়েনাকে মারিয়ামের থেকে সর্বদাই আলাদা করে রাখতো । তাই সারাটা রাস্তা লিয়েনা মাথায় স্কার্ফ আর চোখে সানগ্লাস পরে  আরিয়ানের চোখে ধূলো দেবার চেষ্টা করে এসেছিল । ভেবে ছিল একবার আরিয়ানকে বিছানায় বশীভূত করতে পারলে আরিয়ান আর তাকে ছেড়ে যাবার অবকাশ পাবে না । হাস্যকর ছিল লিয়েনার ভাবনা  । এতো সহজেই কী ভালোবাসার মানুষের পায়ে শিকল পরানো  যায় ?

( ৫ )

পরেরদিন সকালে দুর্যোগ কমে যায় । সুর্যের দেখা না মিললেও আকাশ অনেকটা পরিষ্কার হয়েছে । সকাল সকাল আরিয়ানের ঘুম ভেঙ্গে যায় । বিছানা থেকে উঠে বাথরুমে যায় । ফিরে এসে বড় জানালাটার সামনে এসে দাঁড়ায় । বিছানার যে পাশে লিয়েনা শুয়ে আছে সেইদিকেই বড় জানালাটা । জানালার পর্দা সরিয়ে ঘরে আলো প্রবেশ করায় । কিছুক্ষণ সে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকে । বৃষ্টির জলে স্নাত প্রভাতের স্নিগ্ধ রূপ দেখে আরিয়ানের মন  বড়ই প্রশান্ত । মনে পড়ে যায় তার গতরাতের সঙ্গমের মোহময় আবেশের মুহূর্তকাল । ঘাড় ঘুরিয়ে সে পিছনে তাকায় । দ্যাখে কপাল অবধি লেপ টেনে মারিয়াম অঘোরে ঘুমোচ্ছে । খুব ইচ্ছে হলো তার প্রেয়সীর ঘুমন্ত মুখ দেখতে , আরিয়ান বিছানার পাশে এসে বসে । মুখে তার প্রেমিকের আদর মাখানো স্মিত হাসি । আস্তে আস্তে লেপ সরায় । একবারও স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেনি কী সাংঘাতিক বিষ্ময় তার জন্য অপেক্ষা করছে ! লেপ সরিয়ে লিয়েনাকে দেখে  আরিয়ান হতভম্ব । বিস্ফারিত চোখে লিয়েনাকে দেখে আঁতকে ওঠে,  বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ায় – মারিয়ামের যমজবোন ছোট চুলের লিয়েনা ! ঠিকই তো এর জোড়া ভ্রু নেই ! এতো লিয়েনা ! ….’ লি ….য়ে …না ‘ .. আর্তনাদ করে ওঠে আরিয়ান । লিয়েনা ধড়পড় করে ওঠে বসে । চোখ খুলেই দেখতে পায় আরিয়ানের হিংস্র মুখ , জ্বলন্ত অঙ্গারের মতো আরিয়ানের চোখ তখন ধ্ক্ধ্ক করছে । মুহূর্তক্ষন বাকরুদ্ধ হয়ে যায় লিয়েনা । আরিয়ান আবারও চিৎকার করে ওঠে— ‘ তুমি লিয়েনা ? আমার মারিয়াম কোথায় ? তুমি কী করে এলে এই বিছানায় ? ‘
চতুর লিয়েনা ততক্ষনে নিজেকে স্বাভাবিক করে নিয়েছে —‘ আমি মারিয়াম হতে যাবো কেন ? আমাকে তুমি চার্চে বিয়ে করে এতোদূর কানাডা নিয়ে এলে । তিনদিন আমার সাথে দীর্ঘপথ যাত্রা করলে তাও বলছো আমি মারিয়াম । তারপর কাল রাত্রে আমাকে পাগলের মতো আদর করলে , আমার শরীরের সাথে একাত্ম হয়ে গেলে তারপরও বলছো আমি মারিয়াম । ওঃ আমার জামাকাপড়ও ঠিক মতো পরা হয়ে ওঠেনি এখনও ,’ …বলেই লিয়েনা বিছানায় পড়ে থাকা নাইট গাউনটা বুকে টেনে নেয় ।

— ‘ শয়তানী , আমার মারিয়াম কোথায় ? কী করেছো তার সাথে ? ‘ হুংকার দিয়ে ওঠে আরিয়ান

— ‘ তেমন কিছু করিনি আসার আগের দিন রাত্রে ওর দুধের গ্লাসে দুটো ঘুমের ট্যাবলেট দিয়ে দিয়েছিলাম । মারিয়াম অনেক বেলা করে ঘুমোবে , ঘুম থেকে উঠে আরিয়ান ছেড়ে গেছে দেখে কয়েক দিন কাঁদবে। তারপর একদিন বাবা ওর ভালো ঘরে বিয়ে দিয়ে দেবেন । কিছুদিনের মধ্যেই ও তোমাকে ভুলে যাবে । তুমিও ওকে ভুলে যাও আরিয়ান ডার্লিং । আমিই এখন তোমার বিবাহিত স্ত্রী । তুমিতো দেখেছো আমার জন্য গোয়ার সব ছেলেরা পাগল । আমাকে একরাত পাবার জন্য ওরা যেকোন মূল্য দিতে চায় । আমি কিন্তু কোনদিনই ওদের পাত্তা দিইনি । আমি বরাবর তোমার জন্য পাগল । তুমিই খালি ওই নেকা মারিয়ামের দিকে তাকিয়ে বসেছিলে এতদিন । কাল রাত্রেই টের পেয়ে গেছো আমি কতো সুন্দরী , আমার সাথে রাত কাটিয়ে তুমি তৃপ্ত হয়েছো । আমাকেতো পাগলের মতো আদর করছিলে । এখন অস্বীকার করবে তুমি ? এখন আমিই তোমার সব কিছু । আমাকে নিয়ে সুখে থাকো । আমি তোমায় আমার শরীর মন দুই দিয়েছি । ‘

আরিয়ান লিয়েনার স্পর্ধা ও স্বীকারোক্তি শুনে স্তম্ভিত । রাগে ক্ষোভে আরিয়ান তখন থরথর করে কাঁপছে , বিছানায় ঝাঁপিয়ে পড়ে লিয়েনার টুঁটি টিপে ধরে — ‘ শয়তানী , তোমার অভিসন্ধি আমি অনেক আগেই টের পেয়েছিলাম । বোঝেনি শুধু নিরীহ মারিয়াম । আসলে তোমার মতো সে চতুর আর কপট নয় । সে আমার প্রকৃত ভালোবাসা । আমার ভালোবাসার সাথে তুমি প্রতারণা করেছো । আমার ভালোবাসা কখনই তুমি পাবেনা। আমার চোখে তুমি শয়তানী ছিলে এখন সারাজীবন তাই থাকবে । কথা গুলো বলতে বলতে আরিয়ান রাগে কাঁপছিল । লিয়েনা সেই সুযোগে এক ঝটকায় আরিয়ানকে বিছানা থেকে ঠেলে মেঝেতে ফেলে দেয় ।
আরিয়ান কোন রকমে মেঝে থেকে উঠে দাঁড়ায় , ওর মাথায় তখন খুন চেপে গেছে । এতো বড় ধাক্কা সামলে ওঠা যে সত্যই অসম্ভব তা কেবল ঈশ্বরই জানেন । টলমল পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে যায় তখনই ছোট  টেবিলে রাখা তেলের ল্যাম্পটা হাতে তুলে নেয়, সারারাত ধরে জ্বলছিল ল্যাম্পটা প্রচন্ড গরম ,  তখনও তাতে আগুন নিবু আঁচে জ্বলছিল । অকস্মাৎ আরিয়ান ঘুরে গিয়ে ল্যাম্পটা লিয়েনার মুখ লক্ষ্য করে ছুঁড়ে মারে । লিয়েনা আর্তনাদ করে ওঠে , আরিয়ান সেই দিকে দৃষ্টিপাত না করেই  প্রচন্ড ঘেন্নায় দরজা খুলে নিচে নেমে আসে । সেই শেষ কথা হয় আরিয়ানের সাথে লিয়েনার ।
প্রতারিত বিধস্ত আরিয়ান নিচে নেমে জেসিকাকে সমস্ত কিছু জানায় । আরো জানায় ওই ঠগ প্রতারক লিয়েনার সাথে সে কিছুতেই জীবন নির্বাহ করতে পারবে না । জেসিকার কাছে কিছু টাকা চেয়ে নিয়ে আরিয়ান ওই বাসস্থান ছেড়ে একেবারের মতো অজানা পথে পাড়ি দেয় ।

( ৬ )

সেদিনের পর থেকে জেসিকা তার ভাইয়ের অনেক খোঁজখবর নেবার চেষ্টা করেছিলেন , কিন্তু আরিয়ান কোথায় গেছে কিভাবে আছে কোন খবরই জানতে পারেননি । তবে কয়েকদিনের মধ্যেই ভারতবর্ষ থেকে জেসিকার কাছে ট্রাঙ্ককল আসে –’  গাড়ি অ্যাক্সিডেন্টে মারিয়াম মারা গেছে । আরিয়ান কেমন আছে ? লিয়েনাকে আরিয়ান কেন বিয়ে করেছে? ’

পরবর্তীকালে অবশ্য জেসিকা সব জানিয়ে বাবাকে চিঠি পাঠিয়ে।ছিলেন । সেদিন এই ঘটনা উন্মোচিত হওয়ার পর জেসিকারও লিয়েনার প্রতি রাগ ঘেন্না জন্মে ছিল । কিন্তু তা সত্বেও লিয়েনাকে নিজের বাড়ি থেকে বিতাড়িত করতে পারেননি । আরিয়ান যে মুহুর্তে জেসিকার বাড়ি ছাড়ে তখনই জেসিকা জবাবদিহি করতে উপরে উঠে আসেন । এসে তিনি যে দৃশ্য দ্যাখেন তাতে তিনি বাকরুদ্ধ হয়ে যান — মুখে ল্যাম্প ছুঁড়ে মারার দরুন মুখের বাঁ দিকটা আগুনে ঝলসে গেছে কপালে গালে  কাঁচের টুকরো গেঁথে আছে তাতে রক্তপাত হয়ে চলেছে । জেসিকা দ্রুত কাছে এসে দেখেন লিয়েনার জ্ঞান নেই । মানবিকতার খাতিরে জেসিকা লিয়েনাকে খুবই দ্রুত হসপিটালে ভর্তি করেন । প্রায় দেড় মাস চিকিৎসার পর লিয়েনা সুস্থ হয় । বিধির বিধান কুৎসিত মনের অধিকারী লিয়েনা এখন কুৎসিত চেহারাতে রূপান্তরিত হয়েছে । সর্বক্ষনই তার মুখ ঢাকা থাকে । ঐ অবস্থায় লিয়েনা তখন দেড় মাসের অন্তঃসত্ত্বা । বাধ্য হয়েই জেসিকা তার বাড়িতে লিয়েনাকে আশ্রয় দেয় ।

          লিয়েনা তার রূপ ও স্বজনের  মনে বিশ্বাস হারিয়ে সম্পূর্ণ একাকী হয়ে যায় । জেসিকা অনেক বুঝিয়ে ছিলেন লিয়েনাকে ভারতবর্ষে ফিরে যাবার জন্য । কিন্তু লিয়েনা বদ্ধপরিকর ছিল এই মুখ নিয়ে আর কোনদিনও স্বদেশে ফিরে যাবে না । সে তার সন্তান কে নিয়ে চার্চের শরণাপন্ন হয় । চার্চের সহযোগিতায় একটা স্কুলে চাকরী পেয়ে যায় । অনেক পরিশ্রম ও আর্থিক কষ্টের ঘাত প্রতিঘাতে মাধ্যমে নিজের ছেলেকে বড় করে । সেই সন্তান আজ ছাব্বিশ বছরের পূর্ণ যুবক । অবিকল আরিয়ানের প্রতিচ্ছবি । সেই রকমই লম্বা সুঠাম বলিষ্ঠ চেহারা , ধোঁয়াটে নীল রংএর চোখ টিকালো নাক  বারে বারে আরিয়ানের কথা মনে করিয়ে দেয় । সে এখন নামকরা সফ্টওয়ার কোম্পানীর ইঞ্জিনিয়ার । লিয়েনা নিজ কৃতকর্মের জন্য জেসিকার কাছে বহুবার মাপ চেয়ে নিয়েছিল , তাই জেসিকা অনেকটা বাধ্য হয়েই লিয়েনার সাথে যোগাযোগ রেখে ছিলেন শুধুমাত্র আরিয়ানের সন্তান ড্যানিয়েলের কথা ভেবে । ছোট ভাইয়ের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া জেসিকাকে আজও কষ্ট দেয় । কত স্বপ্ন নিয়ে এদেশে এসেছিল আরিয়ান । আরিয়ানের স্মৃতি জেসিকার বৃদ্ধ মনে আজও সজীব । জেসিকার দুই ছেলে কর্মসূত্রে একজন স্পেনে স্থায়ী ভাবে বসবাস করে আরেকজন নিউ জার্সিতে থাকে । জেসিকার স্বামী গত হয়েছেন । বৃদ্ধা জেসিকা স্বামীর বাড়িতে একাই থাকেন । ড্যানিয়েল তার পিসিমাকে খুবই ভালবাসে , সে প্রায়ই এসে পিসিমার খোঁজখবর নিয়ে যায় । এই কিছুদিন আগে জেসিকার ফুডপয়জনিং হয়েছিল হসপিটালে ভর্তি করতে হয় । সমস্ত দেখাশোনা ড্যানিয়েল করেছিল । হসপিটাল থেকে জেসিকা ফিরে আসার পর তার দেখাশোনা করার জন্য কিছুদিন ড্যানিয়েল পিসিমার কাছেই ছিল।

( ৭ )

একদিন বৃদ্ধা জেসিকা দুপুরে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন সেই সময় পোস্টম্যান এসে একটি চিঠি দিয়ে যায় । চিঠিটি এসেছিল ভারতবর্ষ থেকে । চিঠি পড়ে জেসিকা এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ে যে ড্যানিয়েলকে অফিসের জরুরী মিটিং ছেড়ে পিসিমার বাড়ি ছুটে আসতে হয় । সুস্থ হলে জেসিকা ড্যানিয়েলকে জানায় — ‘ ড্যানিয়েল তোমাকে কোনদিনই আমি জানাইনি আমার একটা ছোট ভাই আছে । সে আমার থেকে চোদ্দ বছর আট মাসের ছোট ছিল । ভাই এর জন্মের সময় আমাদের মা মারা যান । তাই এই ভাইকে আমি নিজে হাতে বড় করেছিলাম কারণ আমার বাবা নিজের ব্যবসা নিয়েই ব্যস্ত থাকতেন । ও যখন হাই স্কুলে ভর্তি হয় তখন আমার আমার বিয়ে হয়ে যায় । আমি তোমার আঙ্কেলের সাথে কানাডায় চলে আসি । তারপর দীর্ঘ ষোল  বছর পর ভাই একবার এখানে আসে কিন্তু একটি বিশেষ কারণে বাড়ি ছেড়ে চলে যায় । সেই থেকে সে নিরুদ্দেশ । আমি বহু খোঁজাখুঁজি করেছিলাম কিন্তু তাকে পাইনি । ভাইয়ের নিরুদ্দেশের খবর শুনে বাবাও অসুস্থ হয়ে পড়েন । দুবছর পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন তারপর তিনি মারা যান । সেই ভাই আজ মৃত্যুশয্যায় শুয়ে আমাকে চিঠি লিখে পাঠিয়েছে । দূরাগ্য মারণব্যাধি ক্যান্সারে আক্রান্ত সে । শেষ যাত্রায় আমাকে দেখতে চেয়েছে । আরো বলেছে পৃথিবীতে আমি ছাড়া তার আর কেউ নেই যে তার কবরে মাটি দেবে । চিঠিতে তার এই আর্তি দেখে কাল আমি অসুস্থ হয়ে পড়ি । তুমিই বলো এতো বছর ধরে যে ভাই নিখোঁজ ছিল আজ তার যখন খোঁজ পেলাম সে মৃত্যুশয্যায় ! আমার ছোট ভাই আমার সন্তানসম আমার বেঁচে থাকাকালীন তার মৃত্যু হবে ! …এ আমি মেনে নেব কী করে তুমিই বলো ড্যানিয়েল ? আমি কী এতদিন বেঁচে আছি এটা দেখে যাবো বলে ! ‘ …হু ..হু ..কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন জেসিকা । ড্যানিয়েল তার পিসির সামনে বসে ছিল উঠে গিয়ে পিসিমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে সান্তনা দেন ।

— ‘ পিসিমা আপনি কী ভারতবর্ষে আপনার ভাই এর কাছে যেতে চাইছেন ? ‘

— ‘ না ড্যানিয়েল , আমার শরীর এই কাজে সম্মতি দেবে না । তাছাড়া আমি ওর শেষ কথা রাখতে পারবো না কারণ ও আমার ছোট ভাই । তুমি একবার দেখে আসবে ড্যানিয়েল ? ‘

— ‘ আমি যাব ? আপনার শরীর এতো খারাপ আমি এই অবস্থায় আপনাকে ছেড়ে কী করে যাই ?

—‘ আমার কিছু হবে না ।  তোমাকে বলা হয়নি কাল আমার ছোট ছেলে ফোন করে  জানিয়েছে  সে কয়েকদিনের  জন্য এখানে আসছে  । ‘

— ‘ আচ্ছা আমি যাব ভারতবর্ষে । এবার আপনি একটু ঘুমানোর চেষ্টা করুন । আজই আমি ফ্লাইটের টিকিটের ব্যবস্থা করছি ।’

ড্যানিয়েল পিসিমাকে জল খাইয়ে শুয়ে দেয় । তারপর ঘর থেকে বেরোনোর সময় হটাৎ ঘুরে দাঁড়ায় — ‘ পিসিমা আপনার এই ছোট ভাইয়ের নাম আরিয়ান গোমস্ তাই না ? তিনিই তো আমার পিতা  ?

জেসিকা বিছানায় শুয়ে নিঃশব্দে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়েন । আর এই শেষ সময়ে সত্য লুকিয়ে কী করবেন ? বিধাতার দেওয়া এই জন্মে সমস্ত হিসাব নিকেশ  করেই সবাইকে একদিন পৃথিবীর মোহমায়া ছাড়তে হবে । সেই কারণে বোধহয় আরিয়ান প্রায় সাতাশ বছর বাদে দিদি জেসিকাকে চিঠি লিখে ছিল ।

( ৮ )

ড্যানিয়েল যখন গোয়া ডাবোলিম আন্তর্জাতি বিমান বন্দরে নামে তখন গোধূলির স্বর্ণালী আভা ফিকে হয়ে অন্ধকার জমাট বাঁধতে শুরু করেছে । বিমান বন্দরের বাইরে এসে দ্যাখে প্রিপেড ট্যাক্সি ঐখানে ধর্মঘট ডেকেছে । বাধ্য হয়েই ড্যানিয়েল ট্রলি ব্যাগটা টানতে টানতে এয়ারপোর্ট চত্ত্বর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে । বাইরে বেরিয়ে এসে কোন লাভ হলনা । একদম নতুন জায়গা , কোনদিকে যাবে কী করে যাবে কিছুই বুঝতে পারছে না । এদিকে আবার আকাশ মেঘলা করে এসেছে । ঠিক সেই সময় একটা গাড়ি  এসে ড্যানিয়েলের রাস্তা আটকে দাঁড়ায় । দেখে গাড়িটা ঝাঁ চকচকে মনে হচ্ছে কিন্তু গাড়ির মডেলটা কী রকম যেন ! দু হাজার একুশে  এই রকম গাড়ি সচরাচর দেখতে পাওয়া যায় না । বহু পুরোনো মডেল , পুরনো দিনের সিনেমায় দেখতে পাওয়া যায় । ড্যানিয়েল বেশ ভালো করেই গাড়িটা দেখে কিছু বলতে যাবে ঠিক তখনই একজন তরুণী গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন — ‘ এই শহরে নতুন বলে মনে হচ্ছে ? কোথায় যাবেন ? ‘

–‘ হটাৎই এই ভাবে প্রশ্ন ছোঁড়াতে ড্যানিয়েল হকচকিয়ে যায় — ‘ আমাকে জিজ্ঞাসা করছেন ? ‘

— ‘ আপনি ছাড়া এখন এইখানে কেউ দাঁড়িয়ে আছে নাকি ! আপনাকেই বলছি । ‘

—‘ আমি পোন্ডা যাবো । ‘

—‘ গাড়িতে চলে আসুন । আজ কোন ট্যাক্সি পাবেন না । আমি ওইদিকেই যাব । ‘

—‘ কিন্তু আপনি তো আমাকে চেনেন না ‘ !

— ‘ গোয়া টুরিস্ট স্পট, এখানে সবাই বেড়াতে আসে । আমরা গোয়াবাসী অথিতিদের ঈশ্বর বলে  মনে করি । আর আপনাকে দেখতে চোর বদমাশ বলে মনে হচ্ছে না । ‘

ড্যানিয়েল একটু চোখটা তুলে আকাশটা দেখে গাড়িতে উঠে আসে । গাড়িতে উঠে ড্যানিয়েল সিটবেল্ট খুঁজতে থাকে ।

— ‘ আপনি যেটা খুঁজছেন সেটা এই গাড়ির মডেলে নেই । এইটা ফিয়েট । বাবার কেনা বহুবছরের পুরোনো গাড়ি । সত্তর দশকের মডেল । বাবার খুব প্রিয় । খুব ভাল করে মেইন্টেন  করেন । ‘

— ‘ বলেন কী সত্তর দশক ! আমার বিশ্বাস হচ্ছে না ! ইঞ্জিন বদলেছেন নিশ্চয়ই ? ‘

— ‘ হতে পারে আমার ঠিক জানা নেই । বাবা কী করেন কিছুই কাউকে বলেন না । গাড়ি চালনায় আমার হাত পারফেক্ট বলেই আমাকে গাড়ি ছুঁতে দেন ।

— ‘ খুব ভাল কার অনেকটা আপনার মতো ।’

—‘ মানে ? ‘

— ‘ মানে আপনি আমাকে লিফট দিলেন । আর কিছুক্ষণের মধ্যেই বৃষ্টি পড়বে মনে হচ্ছে । রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকলে ভিজে যেতাম । অনেক হেল্প হলো । অনেক ধন্যবাদ আপনাকে । ‘

ব্যস্তময় রাস্তায় গাড়ি দুরন্ত গতিতে ছুটছে । ড্যানিয়েল গাড়ির জানালার কাঁচ নামিয়ে বাইরেটা দেখার চেষ্টা করে কিন্তু জোর বৃষ্টি আসায় পুনরায় গাড়ির জানালার কাঁচ আবার উঠিয়ে দেয় । গাড়ি ছুটে চলেছে , গাড়ির ভিতর একটা দমবন্ধ পরিবেশ । মেয়েটিও নিশ্চুপ । ড্যানিয়েলের যেন মনে হচ্ছিল গাড়ি থামিয়ে একটু বাইরে বেরিয়ে কফি খেলে শরীরটা ভালো লাগবে । তখনই  মেয়েটি জোরে  ব্রেক কষে গাড়িটা থামায় । ড্যানিয়েল হকচকিয়ে মেয়েটির দিকে তাকায় । ……… ‘ চলুন একটু কফি খাওয়া যাক এখনও অনেকটাই রাস্তা বাকি । আপনার আপত্তি নেই তো ? ‘

— ‘ আমিতো ঠিক এটাই ভাবছিলাম । আর আপনি তখুনি বললেন কথাটা । আপনি কী টেলিপ্যাথি জানেন ? ‘

—‘ না আমি টেলিপ্যাথি বিশ্বাস করি না । আপনি এতোটা জার্নি করে গোয়া এলেন আমি আপনাকে এক কাপ কফি অফার করলাম না এটা হতে পারে ?  এয়ারপোর্টে থেকে অনেকটা পথ গাড়ি চালালাম । আপনার একটু বিরতি দরকার তাই বললাম । যাবেন তো ? ‘

— ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ চলুন ! ‘

ওরা এরপর একটা ক্যাফেটেরিয়াতে  ঢুকে দুই চেয়ারের একটা টেবিলে ঠিক করে বসে । ক্যাফেটেরিয়ার ভিতরে সেই রকম লোকের সমারোহ নেই । তিন চারটে টেবিলে দুজন করে বসে আছে । আসলে সন্ধ্যার দিকে ক্যাফেটেরিয়া গুলোতে কখনই সেই রকম ভীড় হয়না । সেই তুলনায় বিয়ার পাব গুলিতে ভীড় উপচে পড়ে । ক্যাফেটেরিয়ার ভিতরে স্বচ্ছ  নীল  আলোআঁধারির পরিবেশ । ড্যানিয়েল ও মেয়েটি মুখোমুখি বসে। । এতক্ষন পরে ড্যানিয়েল মেয়েটিকে সামনাসামনি দ্যাখে । দেখেই ড্যানিয়েলের চোখ আটকে যায় । এতোটা রাস্তা এসেছে একসাথে তবুও বুঝতে পারেনি মেয়েটি এতো সুন্দরী , শুধু সুন্দরী বলা ভুল  হবে অসম্ভব নিখুঁত সুন্দরী । ঈশ্বর যেন অনেক সময় নিয়ে মন দিয়ে গড়েছেন । গাড়িতে এতক্ষন মাথায় স্কার্ফ জড়ানো ছিল , সেই গোলাপী স্কার্ফটা খুলে টেবিলে রাখা । এক্ঢাল রেশমের মতো লম্বা চুল চেয়ারের সিট ছাড়িয়ে ঝুলছে । পাতলা ঠোঁটে হাল্কা গোলাপী লিপস্টিক । চিকন জোড়া ভ্রু যুগল টানা চোখ দুটিকে বড় আকর্ষনিয় করে তুলেছে । ড্যানিয়েলের পলক পড়েনা । দুর্নিবার আকর্ষনে সে যেন মনমুগ্ধ ।

— ‘ কী হলো কফি খাবেন না?  ? হ্যাঁ করে কী দেখছেন ? ‘

মেয়েটির ডাকে ড্যানিয়েলের স্তম্ভিত ফিরে আসে । ড্যানিয়েল কোন রকম ভনিতা না করেই বলে বসে — ‘ আপনি অসম্ভব সুন্দরী । ছোটবেলায় রূপকথার বইতে পরীদের ছবি থাকতো । আপনাকে ঠিক তাদের মতো দেখতে । আমার কথায় একটুও মিথ্যা নেই , বিশ্বাস করুন । কী নাম আপনার জানতে পারি ? আমি ড্যানিয়েল গোমস্ । কানাডাবাসী । পেশায় সফ্টওয়ার ইঞ্জিনিয়ার । ‘ …. ড্যানিয়েল করমর্দনের জন্য হাতটি এগিয়ে দেয় মেয়েটির দিকে ।
মেয়েটি স্মিত হেসে হাত বাড়িয়ে করমর্দন করে বলে — ‘ আমি মারিয়াম গেরিন । ক্ল্যাসিক্যাল মিউজিক নিয়ে স্নাতক করেছি । ‘

— ‘ কিছু মনে করবেন না , আপনি কী বিবাহিত ?

বিয়ের নাম শুনেই মেয়েটির মুখের চেহারায় কেমন একটা  বিষন্নতা ফুটে উঠলো ।  চোখ দুটি  চিক চিক করে উঠলো  । যেন গলার ভিতর থেকে জল শুকিয়ে গিয়ে পাতলা ঠোঁটদুটি আরো হাল্কা শুস্ক করে তুলেছে  । ধীরে ধীরে সে মাথা নিচু করে। আঙ্গুলের নখ  দিয়ে কফি মগের হাতলটায় দাগ কাটতে থাকে। 

— ‘ মাপ করবেন আমি মনে হয় প্রশ্নটা করে আপনাকে বিব্রত করলাম । খুব ভাল কফি । এতো ভাল কফি জন্য অনেক ধন্যবাদ আপনাকে । চলুন এবার বেরিয়ে পড়া যাক । ‘

সন্ধ্যে অনেকটাই ঘনীভূত হয়ে এসেছে । বৃষ্টি ভেজা রাস্তা ল্যাম্পপোস্টের আলোয় হীরক কুচির  মতন চিক চিক করছে । ড্যানিয়েল জানালার কাঁচ নামিয়ে বাইরের মোলায়েম শীতল বাতাস উপভোগ করে । নিস্তব্ধতা ভেঙ্গে মারিয়াম জানায় — ‘ আপনার ঠিকানা কিন্তু এসে গেছে সামনের বাঁক ঘুরে ডানদিকের রাস্তাটাতেই পড়বে গোমস্ হাউস প্রথম দুটো বাড়ি ছেড়ে তিন নম্বর বাড়ি । আমি আপনাকে বাঁকটায় নামিয়ে দেবো । কারণ আমি সোজা বেরিয়ে যাবো । ‘

এবারও জোরে ব্রেক কষে গাড়ি থামায় । ড্যানিয়েল গাড়ি থেকে নেমে পিছনের সিট থেকে ট্রলি ব্যাগটা নামিয়ে সামনের জানালার কাছে আসে — ‘ গন্তব্যে নিশ্চিন্তে পৌঁছাতে পেরে বেশ ভাল লাগছে । কিন্তু মনটা বড় খারাপ হয়ে গেল একটি সুন্দরী মেয়ের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হলাম বলে । ভারতবর্ষের মাটিতে পা রেখেই আপনার আন্তরিক আপ্যায়ন আমাকে মুগ্ধ করেছে । শুনেছিলাম ভারতীয়রা অতিথিপরায়ণ আজ নিজের অভিজ্ঞতা দিয়ে উপলব্ধি করলাম । আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ জানাবো ভেবে পাচ্ছি না তাও বলছি অনেক ধন্যবাদ আমাকে লিফট দেয়ার জন্য এবং ভাল কফি খাওয়ানোর জন্য । ‘ …ড্যানিয়েল করমর্দনের জন্য হাত বাড়ায় । 

ড্যানিয়েলের সাথে করমর্দন করে মারিয়াম বলে — ‘ জানেন আমার ফিয়ন্সে   অচেনা ব্যাক্তিকে লিফট দেওয়া একদম পছন্দ করে না । আমি এতোটা পথ লিফট দিয়েছি জানলে আমার উপরে রাগ করবে । কিন্তু এয়ারপোর্টে আপনাকে দেখে আমার খারাপ মানুষ মনে হয়নি । তাই লিফট দিয়েছি । তাছাড়া তিন ঘন্টা সময় কী ভাবে কেটে গেল বুঝতে পারলাম না । আচ্ছা আসি , আবার দেখা হবে , এই ভাবে না হোক অন্য ভাবে হবেই । ‘ …দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দিয়ে হাত নেড়ে মারিয়াম বেরিয়ে গেল ড্যানিয়েলের দৃষ্টির সম্মুখ থেকে । সামনের রাস্তার ঘোলাটে অন্ধকারে ফিয়েট ওয়ান টোয়েন্টি ফোর অদৃশ্য হয়ে গেল যেন ।

মেয়েটি যাবার সময় যেন একটা মোক্ষম তীর  ছুঁড়ে গেল , আর তা সজোরে বিঁধলো যেন ড্যানিয়েলের অন্তর স্থলে । যাবার সময় জানান দিয়ে গেল মেয়েটির প্রেমিক আছে । পরীর মতো সুন্দরী মেয়ের প্রেমিক থাকা কোন আশ্চর্যের ব্যাপার নয় । তবুও ক্যাফেটেরিয়াতে মেয়েটিকে সামনাসামনি দেখে মুগ্ধ হয়ে যায় ড্যানিয়েল । এইতিন ঘন্টায় মেয়েটির সঙ্গদান মনের মধ্যে একটা নরম জায়গা করে নিয়েছিল । সেই কারণে ড্যানিয়েল বুকের ভিতর একটু যেন শূন্যতা অনুভব করলো । ড্যানিয়েল সামনের রাস্তা থেকে চোখ আর মন দুই সরিয়ে নিয়ে বাঁদিকের রাস্তাটা ধরলো । মেয়েটি ঠিকই বলেছে তিন নম্বর বাড়ি গোমস্ হাউস । পোন্ডা মনে হয় খুব বড় অঞ্চল নয় তাই বোধ হয় মেয়েটি সবাইকে চেনে । …ড্যানিয়েল ভাবতে ভাবতে লোহার বড় গেট খুলে ভিতরে ঢোকে । অনেকটা বাগান পেরিয়ে তারপর দোতলা বাড়ি । বহু পুরোনো বাড়িটার সামনে বড় দরজা । দরজার মাথায় একটা বাল্ব জ্বলছে । দরজার পাশে কাঠের রংচটা নেমপ্লেটে ‘ থার্টি বি গোমস্ হাউস ‘ লেখা । ড্যানিয়েলের বুকটা মোচড় দিয়ে ওঠে । মনে মনে নিজেকে বলে — ‘ এই সেই বাড়ি যেখানে আমার জন্মদাতা থাকেন । এই সেই বাড়ি , জন্মের পর আমার নিজের বেড়ে ওঠার কথা ছিল । এই বাগানের চৌহদ্দির ভিতর আমার শৈশব কাটানোর কথা ছিল । সব কিছু থেকে বঞ্চিত থাকলাম আমি । কোনদিনই মা বাবার সমন্ধে কোন কথাই বলেননি । কতবার জিজ্ঞাসা করেছি বাবার নাম পর্যন্ত বলেননি । উল্টে মা ছোটোবেলা থেকে ভয় দেখিয়ে এসেছেন বাবার কথা বেশী জিজ্ঞাসা করলে মাকেও হারাতে হতে পারে । সেই ভয়ে আমি বরাবর চুপ থেকে এসেছি । আজ এই মুহুর্তে তাই মনে বিচিত্র অনুভূতি আসছে । আমার বাবার সাথে প্রথম দেখা হবে , যিনি কিনা মৃত্যুশয্যায় । হা ! ঈশ্বর বিচিত্র তোমার বিধান । ‘ …. ড্যানিয়েল একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে দরজার কড়া নাড়ে । দুবার কড়া নাড়ার পর একজন বৃদ্ধা মহিলা দরজা খুলে দাঁড়ালেন ।
আরিয়ানের চিঠিতে যে ফোননম্বর উল্লিখিত ছিল তাতে জেসিকা ফোন করে আগাম জানিয়ে রেখেছিলেন ড্যানিয়েল আজ পোন্ডার বাড়িতে পৌঁছবে । যে কিনা আরিয়ানের ঔরসজাত সন্তান । তিনি এটাও বলে রেখেছিলেন জেসিকার অনুরোধেই ড্যানিয়েল যাচ্ছে আরিয়ানের কাছে। তাকে যেন কোন রকম অসম্মান না করা হয় ।

— ‘ আপনি ড্যানিয়েল ? কানাডা থেকে আসছেন ?

— ‘ হ্যাঁ আমি ড্যানিয়েল গোমস্ । কানাডা থেকে আসছি ‘।

— আসুন আসুন , ভিতরে আসুন । আপনার থাকার ও বিশ্রামের জন্য সব ব্যবস্থা করে রেখেছি । আপনাকে এয়ারপোর্ট থেকে আনা আমাদের কর্তব্য ছিল । কিন্তু এই বাড়িতে আমরা দুজন থাকি । দুজনই বৃদ্ধ ও অসুস্থ । তাই আপনাকে আনা আমাদের সম্ভব হয়নি । আপনি সময় মতো চলে এসেছেন । রাস্তা চিনতে কোন অসুবিধা হয়নি তো ?

— ‘ আমাকে চিনে আসতে হলে হয়তো আমি আজ মাঝ রাত কিংবা পরেরদিন সকালে পৌঁছাতাম । আপনাদের এই এলাকার একটি মেয়ে আমায় এয়ারপোর্ট থেকে লিফট দিয়েছিল তাই ঠিক সময়ে পৌঁছাতে পেরেছি । আমি কী আপনার পরিচয় জানতে পারি ? ‘

—‘ আমি জুলিয়ান বথাম , আরিয়ানের বাবার দূরসম্পর্কের বোন । আমার স্বামী ইন্ডিয়ান আর্মিতে ছিলেন । বর্ডারে জঙ্গী হামলায় তিনি মারা যান । আমি নিঃসন্তান । আমাকে দেখার কেউ নেই বলে আরিয়ানের বাবা আমাকে এই বাড়িতে নিয়ে আসেন । তখন আরিয়ান কলেজে পড়তো । প্রায় চল্লিশ  বছর এই বাড়িতে আছি । আমাকে আপনি গ্রান্ডমা  বলে ডাকতে পারেন । ‘

— ‘ ও আচ্ছা , ধন্যবাদ । এতদূর থেকে যাকে দেখতে এলাম তাঁকে একবার দেখে আসি । তারপর না হয় আমি রেস্ট নেব । ‘

— ‘ আপনি আসার কিছুক্ষণ আগে ডক্টর এসেছিলেন । খুব যন্ত্রণায় কষ্ট পাচ্ছিল আরিয়ান । এই ব্যাথা তো কমার নয় তাই ডক্টর ঘুমের ইঞ্জেকশন দিয়ে গেলেন । আমি ওর কাছেই ছিলাম , এইমাত্রই ঘুমোলো । তাই বলছিলাম কাল সকালে দেখা করবেন । ‘

— ‘ ঠিক আছে আমি ওনাকে জাগাবোনা । দূর থেকে একবার দেখে চলে আসবো । ‘

ড্যানিয়েল আরিয়ানের ঘরে ঢুকতেই নাকে সুতীব্র ওষুধের কটু গন্ধ অনুভব করলো । অন্ধকার ঘরে শুধু মাথার পিছনের দিকে একটা বেগুনি আলোর নাইট ল্যাম্প জ্বলছে । ড্যানিয়েল খুব কাছে গিয়ে দেখলো বিছানায় একটা যেন কঙ্কালসার দেহ শুয়ে আছে নাকে মুখে নল পরে  । শুধুমাত্র হাড়ের কাঠামোতে চামড়া আটকানো । দীর্ঘদেহী মানুষটার মাত্র চুয়ান্ন বছরে কী চরম পরিণতি ! ড্যানিয়েলের মন বিসন্ন হয়ে যায় । মনে মনে বিড়বিড় করে ওঠে — ‘ ইনিই আমার বাবা  ! ‘ পর মুহুর্তেই ড্যানিয়েল ঘর থেকে বেরিয়ে আসে । 


পরের দিন সকালে ড্যানিয়েল একটু দেরীতে ঘুম থেকে ওঠে । সারাটা রাত সেই মেয়েটির স্বপ্নে বিভোর ছিল ——‘ নীল আকাশ আড়াল করে মেয়েটির লম্বা রেশমের মতো চুল বাতাসে পাল তুলেছে । চিবুক তুলে চোখ বন্ধ করে মেঘে হেলান দিয়ে বসে ঘুমিয়ে আছে যেন মেঘপরী । পরীর ডানা মাটি থেকে তুলে ড্যানিয়েল মেঘ টপকে দৌড়াচ্ছে । একবার ডানা নিয়ে যেতে পারলে বোধ হয় পরী তার কাছে ফিরে আসতে চাইবে । ড্যানিয়েল পিছন ফিরে তাকাতে তাকাতে দৌড়াচ্ছে । হটাৎই আছড়ে পড়ে বুনো লতানে গাছে পা আটকে । ডানা আবার হাত থেকে পড়ে মেঘে হারিয়ে যায় । ডানা পুনরায় খোঁজার বাসনায় ড্যানিয়েল মেঘের মধ্যে হামাগুড়ি দিয়ে হাতড়াতে থাকে তখনি লতানো গাছটি ড্যানিয়েলকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে ফ্যালে, ড্যানিয়েল নিঃশ্বাস নিতে পারে না । দম আটকে আসে । শ্বাসরোধ হয়ে ছটফট করতে থাকে । ……ঘুম ভেঙ্গে যায় । ড্যানিয়েল উঠে বসে , পরীর ডানা হারানোর ব্যাথা আধ ঘুমন্ত মস্তিস্ককে পাক খেতে থাকে । ড্যানিয়েল ঘড়ির দিকে তাকায় প্রায় নটা বাজতে চলেছে । ড্যানিয়েল তাড়াতাড়ি বিছানা ছেড়ে বাথরুমে ঢোকে । বাথরুম থেকে পরিচ্ছন্ন হয়ে  পোষাক বদলে   ঘর থেকে বেরিয়ে আসে ।
বৃদ্ধা জুলিয়ান ড্যানিয়েলকে দেখতে পেয়ে ডাইনিং টেবিলে ডাকেন । ড্যানিয়েল জলখাবারের পর আরিয়ানকে দেখার আগ্রহ প্রকাশ করে । বৃদ্ধা মহিলা বললেন — ‘ হ্যাঁ চলুন । আরিয়ানকে কিছুক্ষণ আগে রাইস  টিউবে  খাবার খাইয়ে এলাম । বোধ হয় এখন জেগেই আছে । দু একটা কথা বলতে পারে । ‘

— ‘ মাপ করবেন ! কাল থেকে আপনি আমায় আপনি বলে সম্মোধন করছেন , হয়তো আমি আপনাদের সম্পর্কের কেউ নই । জেসিকা অ্যান্টির কথায় মিঃ গোমস্ কে দেখতে এসেছি । আপনি আমাকে তুমি বলে ডাকলে আমার খুব ভাল লাগবে । ‘

জুলিয়ান স্মিত হেসে বললেন –‘ ঠিক আছে তাই হবে । আর আমি জানি তুমি আমাদের রক্তের সম্পর্কের । তোমার কী সেটা জানা আছে ? ‘

— ‘ হ্যাঁ , ছাব্বিশ বছর বাদে এই দুদিন আগে জানতে পেরেছি মিঃ গোমস্ আমার বাবা । আচ্ছা উনি কী জানেন আমার পরিচয় ? ‘

বৃদ্ধা জুলিয়ান ড্যানিয়েলের পিঠে হাত বুলিয়ে বললেন — ‘ হ্যাঁ জানে , জেসিকা তার ভাইকে তোমার পরিচয় দিয়েছেন । ‘

আরিয়ানের ঘরে প্রবেশ করে বৃদ্ধা জুলিয়ান আরিয়ানকে ডাকে — ‘ আরিয়ান তুমি জেগে আছো ? ড্যানিয়েল এসেছে তোমাকে দেখতে । ‘

আরিয়ান চোখ বন্ধ করেছিল । ধীরে ধীরে চোখ খুলে তাকায় । তার দূর্বল চোখের সামনে তিনি  যেন নিজের প্রতিমূর্তি দেখছে , সেই সাতাশ আটাশ বছর আগের আরিয়ান যেন তার সম্মুখে দাঁড়িয়ে আছে । অবাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । সেই মুহুর্তে ড্যানিয়েল আরিয়ানের খুব কাছে সরে এসে দাঁড়ায় —‘ বাবা আমি ড্যানিয়েল । আপনি আজ কেমন আছেন ? ‘

বাবা ডাক শুনে আরিয়ানের দুচোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ে । ধীরে ধীরে বলে — ‘ তোমার আসার কথা শুনে আমি চিন্তিত ছিলাম । মারিয়ামকে বলেছিলাম এতদূর থেকে ছেলেটা আসছে । গোয়ায় নেমে রাস্তা চিনে পৌঁছাতে পারবে কিনা । পোণ্ডা খুব ভিতরে । মারিয়াম বলেছিল আমায় চিন্তা না করতে , ড্যানিয়েল ঠিক পৌঁছে যাবে । ‘

আরিয়ানের মুখে মারিয়াম এর নাম শুনে হকচকিয়ে যায় ড্যানিয়েল । ড্যানিয়েল মনে মনে বলে ওঠে —‘ তারমানে মারিয়াম ওনার কথায় আমাকে আনতে গিয়েছিল ! সেই কথা তো মারিয়াম একবারও উল্লেখ করেনি ! যাক মেয়েটি তাহলে এনাদের চেনা । তাহলে মারিয়ামের ঠিকানা নিয়ে দেখা করে আসা যাবে । ‘

— ‘ তুমি ভাল আছো ? খাবার খেয়েছো ? প্রশ্ন শুনে ড্যানিয়েলের স্তম্ভিত ফেরে । সে আরও কাছে সরে এসে আরিয়ানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলে — হ্যাঁ বাবা , আমি ভাল আছি । আমি খাবার খেয়েছি । আপনি আর কথা বলবেন না । এবার আপনি বিশ্রাম করুন । ‘
ড্যানিয়েলের হাতের স্পর্শ পেয়ে আরিয়ানের চোখ বুজে আসে। চোখের দুকোন থেকে পুনরায় জল গড়িয়ে পড়ে । তা দেখে ড্যানিয়েলের চোখদুটি চিক চিক করে ওঠে । সে ধীরে ধীরে ঘর থেকে বেরিয়ে এসে ড্রয়িং রুমে এসে বসে । কিছুক্ষণ পর জুলিয়ান ওই ঘর থেকে বেরিয়ে আসেন । তিনি ড্যানিয়েলের পাশে এসে বসেন । — ‘ আজ আমি আরিয়ানের চোখে মুখে আনন্দ দেখলাম । একবারও আজ ব্যাথার কথা বলেনি । প্রায় আটমাস আগে অন্ত্রে ক্যান্সার ধরা পড়ে । এমনিতেই খাওয়া দাওয়ার অনিয়ম ছিল। ক্যান্সারের খবর জানতে পেরে আরো অনিয়ম শুরু করে । জেনে শুনেই মদকে আপন করে নিয়েছিল । বহু বছর আগেই ওর বাঁচার ইচ্ছে চলে যায় । আর এখন লাস্ট স্টেজ । সারা শরীরে ক্যান্সার ছড়িয়ে গেছে । ডক্টর বলেই দিয়েছেন আর টেনেটুনে বড় জোর দিন দশেক বাঁচতে পারে । ‘

ড্যানিয়েল মন দিয়ে জুলিয়ানের কথা শুনছিল । একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলে — ‘ খুবই দুঃখজনক । ঈশ্বর যেন ওনাকে শেষ মুহুর্তে যেন একটু আরাম দেন ‘ ।
জুলিয়ান ও ড্যানিয়েল কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে বসে থাকে । এরপর ড্যানিয়েল নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে বলে — ‘ আচ্ছা , মারিয়াম মেয়েটি কোথায় থাকে ? একবার ওনার সাথে দেখা করা যেতে পারে ? ‘

জুলিয়ান স্মিত হেসে বলেন — ‘ তাকে কোথায় পাবে ? তাকে যদি পাওয়া যেত তবে আরিয়ানকে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করার প্রয়াস করতে হতো না । আজ থেকে প্রায় চব্বিশ বছর ধরে দেখছি আরিয়ান তার মৃত প্রেমিকার সাথে কথা বলে চলেছে প্রতিনিয়ত । পোণ্ডা এলাকার সবাই জানে মৃত মারিয়ামের সাথে আরিয়ান কথা বলে । ওদের প্রেম কাহিনী কারোরই অজানা নয় । ‘

—‘ না না , আমি তাঁর কথা বলছি না । কাল যে মেয়েটি আমাকে এয়ারপোর্ট থেকে লিফট দিলো । একদম সামনের মোড় পর্যন্ত এসে নামিয়ে দিয়ে গেল। সেই মারিয়ামের কথা বলছি । যিনি ফিয়েট ওয়ান টোয়েন্টি ফোর গাড়িটা এখনও ব্যবহার করে । খুব ভাল ড্রাইভ জানে । আমরা ক্যাফেটেরিয়া একসাথে বসে কফি পান করেছি । সেখানেই উনি বলেছিলেন ওনার নাম মারিয়াম । ওনার লম্বা রেশমের মতো চুল , চিকন জোড়া ভ্রু । পরীর মতো দেখতে । ‘
ড্যানিয়েলের বর্ণনা শুনে জুলিয়ান স্তম্ভিত । অবাক বিষ্ময়ে ড্যানিয়েলের দিকে তাকিয়ে আছেন । মুখ থেকে তাঁর স্বর বেরোচ্ছে না । বৃদ্ধা এবার উঠে আরিয়ানের ঘরে যান । কয়েক মিনিট বাদে হাঁপাতে হাঁপাতে ফিরে আসেন হাতে মোটা বই এর মতো কিছু একটা জিনিস নিয়ে । ধপ করে ড্যানিয়েলের পাশে বসলেন । তখনও তিনি জোরে জোরে নিঃশ্বাস নিছেন । —‘ এই দেখো এটা আরিয়ানের যৌবনকালের অ্যালবাম । তুমি যে মেয়েটির কথা বলছো দেখো তো এই সে কিনা ? ‘

ড্যানিয়েল মন দিয়ে সাদা কালো ছবিটি লক্ষ্য করে একদম হতবাক হয়ে যায় । সে আমতা আমতা করে বলে — ‘ হ্যাঁ হ্যাঁ অবিকল সেই মেয়েটি ।’ তারপর পাতা উল্টোতে থাকে । পরের পাতায় যে ছবিটি সাঁটা আছে সেটি বেশ বড় । তাতে মেয়েটির দ্বৈত ছবি । ড্যানিয়েল আবারও পাতা উল্টায় —‘ এই তো সেই ফিয়েট ওয়ান টোয়েন্টি ফোর । সমুদ্রের ধারে তোলা ছবি । গাড়ির বাঁদিকে দরজার কাছে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেই মেয়েটি , তাঁর পাশে যে পুরুষটি দাঁড়িয়ে আছেন তিনি যেন আমার মতোই দেখতে । ‘ কথা গুলো বলতে বলতে ড্যানিয়েল জুলিয়ানের দিকে তাকায় । জুলিয়ানেরও মুখে চোখে বিষ্ময় । — ‘ প্রথম পাতায় যে ছবিটি আছে সেটা মারিয়ামের ছবি । তাঁর পরের পাতায় মারিয়াম ও তাঁর যমজ বোন লিয়েনা । ভালো করে দেখো একজনের জোড়া ভ্রু নেই , চুল কাঁধ অবধি ছাঁটা । সেই লিয়েনা । ‘

ড্যানিয়েলের বিষ্ময়ের উপরে বিষ্ময়ের পালা । এই প্রথম সে তার মায়ের আসল চেহারা নিরীক্ষণ করতে পারলো । বিশ্বাসই হচ্ছে না এই সুন্দরী মহিলা তার মা । জন্ম থেকে দেখে আসছে তার মায়ের অ্যাক্সিডেন্টে পোড়া মুখ , হত কুৎসিত । ড্যানিয়েলের চোখদুটি জলে ভরে আসে । জুলিয়ান এবার উঠে দাঁড়ালেন এবং ড্যানিয়েলকে ইশারায় উঠে দাঁড়াতে বললেন । ড্যানিয়েল উঠে দাঁড়ালে জুলিয়ান তার হাতটা ধরে টেনে ধীরে ধীরে বাড়ির পিছনের বাগানে নিয়ে যান — ওই দ্যাখো সেই ফিয়েট কার । আজ থেকে চব্বিশ বছর আগে অ্যাক্সিডেন্টে ক্ষতিগ্রস্ত গাড়িটাকে আরিয়ান এ বাড়ি নিয়ে আসে । তারও তিন বছর আগে গাড়িটার অ্যাক্সিডেন্ট হয় । সেই দুর্ঘটনায় মারিয়াম মারা যায় । মারিয়াম খুব ভাল গাড়ি চালাতো তবুও কী ভাবে যে অ্যাক্সিডেন্ট করলো বোঝা যায়নি । আর এই তিন বছর আরিয়ান কোথায় ছিল কেউ জানে না । তবে কানাডায় প্রথমে গিয়েছিল আমরা সকলে জানি । আরিয়ানের বাবা ছেলের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া মেনে নিতে পারেননি , সিঁড়ি থেকে পড়ে পক্ষাঘাত হয় ,  কিছু দিনের মধ্যেই মারা যান । ছেলে ফিরে এসেছে সেটা তিনি  দেখে যেতে পারেননি ।
আরিয়ান অসুস্থ হবার আগে পর্যন্ত ভাঙ্গা গাড়িটিকে রোজ যত্ন করে মোছামুছি করতো । বলতো এই গাড়ি ভিতর সে মারিয়ামের গায়ের গন্ধ পায় । এই গাড়িটি দেখেছিলে কাল ? ‘

— ‘ হ্যাঁ এই গাড়িটিই ছিল । তবে সেটা প্রায় নতুন ছিল । ‘

— ‘ এই চত্তরে ফিয়েট কার একটি । যেটা বহুবছর ধরে আমাদের বাগানে পড়ে আছে । তুমি ভিতরে চলো আমি ওদের প্রেমকথা শোনাবো তোমাকে। ‘ ভিতরে গিয়ে জুলিয়ান অতীতের সব ঘটনা ড্যানিয়েলের কাছে ব্যাক্ত করেন । সমস্ত বৃতান্ত শুনে ড্যানিয়েল বাকরুদ্ধ । সে এতটাই আবেগপ্রবণ হয়ে ওঠে যে কখন অশ্রুজল তার দুগাল বেয়ে নেমে এসেছে খেয়ালই ছিল না । তার নিজের মায়ের প্রতারনা ছল কপটতার বৃতান্ত শুনে সে লজ্জিত হয় । তার মায়ের ভুলের  জন্য তিন তিনটে জীবন তছনছ হয়ে গেল আর তার শাস্তি স্বরূপ ড্যানিয়েলকে পিতৃ পরিচয়হীন হয়ে সমাজের সব তিরস্কার মেনে নিতে হয়েছে ।

সেদিন রাত্রে ড্যানিয়েল আবারও ওই একই স্বপ্ন দ্যাখে । স্বপ্নে সে মেঘের ভিতরে হারিয়ে যাচ্ছিল। তখনই দেখতে পায় — চিবুক তুলে চোখ বন্ধ করে মেঘে হেলান দিয়ে বসে ঘুমিয়ে আছে যেন মেঘপরী । মারিয়ামের মুখ ভেসে উঠতেই ড্যানিয়েলের ঘুম ভেঙ্গে যায় । ড্যানিয়েল বিছানায় উঠে বসে । তারপর কী মনে হয় তার বিছানা থেকে নেমে আরিয়ানের ঘরে যায় । দরজার পর্দা সরিয়ে হতবাক ! বিছানায় আরিয়ানের পাশে সিলিং -এর দিকে চিবুক তুলে চোখ বন্ধ করে খাটে হেলান দিয়ে বসে ঘুমিয়ে আছে মারিয়াম ! সেই দৃশ্য দেখে ড্যানিয়েলের হাত পা ঠান্ডা হয়ে আসে , জিভ শুকিয়ে ওঠে । একমুহূর্ত আর অপেক্ষা না করে প্রায় টলতে টলতে নিজের ঘরে গিয়ে দরজা দেয় ।

পরেরদিন খুব ভোরে জুলিয়ান দরজার কড়া নেড়ে ড্যানিয়েলকে ঘুম থেকে তুলে জানান গতরাত্রে আরিয়ান পৃথিবীর মায়া কাটিয়ে চলে গেছে । ড্যানিয়েলের বুকের ভিতরটা মুষড়ে ওঠে । যতই হোক তাঁর  জন্মদাতা  । কালকে অতীতের সমস্ত ঘটনা শোনার পর  ড্যানিয়েল তাঁর  বাবা  আরিয়ানের প্রতি মায়া জমে গেছে যেন । অপূর্ণ প্রেমের ইতিকথা বড়ই যে বেদনা দায়ক । ইহজীবনে দুই প্রেমিক যুগল স্বপ্ন পূরণে ব্যর্থ ছিল । মৃত্যুর  পর তাঁদের প্রেম যাতে পূর্ণতা পায় সেই ব্যবস্থা ড্যানিয়েল নিজে হাতে করে দেয় । মারিয়ামের কবর খুঁড়ে মারিয়ামের কফিনের পাশে আরিয়ানের কফিন রাখার ব্যবস্থা করে দেয়  । সকাল থেকে ড্যানিয়েলের মনে বিষন্নতার ঘন বাদল ছেয়েছিল । কিন্তু প্রথম একমুঠো মাটি কফিন দুটির উপরে ছড়িয়ে দেবার পর ড্যানিয়েল নিজের বুকের ভিতরে প্রসন্ন অনুভব করলো । সেই তৃপ্তির আবেশে ড্যানিয়েল আকাশের  দিকে একবার মুখ তুলে তাকায় । আকাশে মেঘরাশির ভিতর চিবুক তুলে চোখ বন্ধ করে মেঘে হেলান দিয়ে বসে ঘুমিয়ে আছে স্বপ্নে দেখা মেঘপরী মারিয়াম । তার পাশে হাসি মুখে বসে আছে আরিয়ান । কিছু সময়ের মধ্যে তাঁরা মেঘ কুয়াশার আড়ালে অদৃশ্য হয়ে যায় ,  ঝরে  পড়ে অজস্র বারিধারায় সদ্য শায়িত  কবরের উপর ।  পৃথিবীর মাটিতে যে প্রেম পূর্ণতা পায়নি অবশেষে মাটির তলে সেই প্রেম পূর্ণতা পায় ।


সমাপ্ত ॥

কলমে শুভ্রা রায়

Write and Win: Participate in Creative writing Contest & International Essay Contest and win fabulous prizes.

2 COMMENTS

  1. “সময়ের আবর্তে মারিয়াম” ….. গল্প টি মন ছুঁয়ে গেলো … বহুদিন পরে পড়া একটি সুন্দর মনোরম প্রেম কাহিনী । মনে রেশ থেকে যাবে গল্প টি।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here