আজ নীহারিকা ওরফে মোম এবং আদিত্য ওরফে ডোডোর বিবাহিত জীবন একমাস পূর্ণ হয়েছে।তারা হানিমুন থেকে বাড়ি ফেরার পর  স্নান সেরে নিজেদের রুমে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলো।

ঘড়িতে ঢং ঢং করে বেজে উঠলো দুপুর ১ টা।এমন সময় নীহারিকার দেওর শারণ্য ওরফে গুড্ডু  এসে বললো “বৌদিভাই, মা তোমাকে এবং দাদাইকে নিচে ডাকছে।তাড়াতাড়ি এসো”। তারপর সে চলে গেলো।
নীহারিকা এবং আদিত্য নীচে নেমে আসার পর নীহারিকার শাশুড়িমা অনুরাধা দেবী তার হাত ধরে ডাইনিং টেবিলে বসালেন।নীহারিকা দেখলো তার শাশুড়ি টেবিলের মধ্যে পঞ্চব্যঞ্জন সাজিয়ে রেখেছেন।একটা কাঁসার থালায় বাসমতী চালের ভাত এবং থালার চারপাশে থরে থরে বাটি সাজানো রয়েছে।বাটিগুলোতে রয়েছে  ডিমের ঝোল, আমডাল,আলুপোস্ত,ধোঁকার ডালনা,বাটার পনীর মশলা,মিক্সস ভেজ,গোলাপ জামুন,রাজভোগ,পায়েস, দই এবং চাটনি।এছাড়াও দুটি কাঁচের প্লেটের মধ্যে রয়েছে পাঁপড়ভাজা এবং বিভিন্ন ধরনের কাটা ফল।
নীহারিকা অবাকদৃষ্টিতে অনুরাধা দেবীর মুখের দিকে চেয়ে রইলো।তখন অনুরাধা দেবী বললেন ” আজ পয়লা বৈশাখ।আমি ঠিক করেছি,প্রতি বছর এইদিনটাতে আমি “বৌমাষষ্ঠী” পালন করবো।তাই আমার বৌমার জন্য আমি তার পছন্দের সব পদগুলো রান্না করেছি।গতকাল তোর বাপি অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে মিষ্টির দোকান থেকে তোর প্রিয় মিষ্টি এবং এক হাঁড়ি দই নিয়ে এসেছে এবং গুড্ডু সব্জি বাজারে গিয়ে সব্জি নিয়ে এসেছে”।
অনুরাধা দেবীর মুখ থেকে কথাগুলো শোনার পর নীহারিকা ভীষণই অবাক হয়ে গেলো এবং অনুরাধা দেবীর হাত ধরে বললো “মামনি,আমি তোমাকে যত দেখছি তত অবাক হচ্ছি।তুমি সমাজের কারোর কথা তোয়াক্কা না করে একজন অনাথিনীকে তোমার পুত্রবধূরুপে গ্রহণ করে নিয়েছো।নিজে দাঁড়িয়ে থেকে আদিত্যর সাথে আমার বিয়ে দিয়েছো।আজকে তুমি কয়েকঘণ্টা ধরে  তীব্র দাবদাহে মাথার ঘাম পায়ে ফেলে আমার জন্য এত পদ রান্না করেছো।আমি সত্যি খুবই ভাগ্যবতী কারণ তোমাদের মামনি এবং বাপি রুপে পেয়েছি।তোমাদের সবার ভালোবাসা পেয়ে আমার মন আনন্দে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছে”।
অনুরাধা দেবী নীহারিকার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন “এই মেয়ে,আর কোনোদিন নিজেকে অনাথিনী বললে আমার থেকে পিট্টি খাবি তুই।তুই জানিস,তোর আগমনে এই বাড়িতে খুশির জোয়ার এসেছে।আদিত্য এবং তুই একে অপরকে ভালোবাসিস তাই সারাটা জীবন তোদের একসাথে থাকতেই হবে।আমরা কেবলমাত্র তোদের একসাথে থাকার ব্যবস্হা করে দিয়েছে।ব্যস আর কিছুই নয়”।
এরপর অনুরাধা দেবী বললেন “মায়েরা সন্তানের মঙ্গলার্থে ষষ্ঠীপুজোর আয়োজন করে।কিন্তু বহুযুগ আগে ষষ্ঠীর আগে #জামাই শব্দটি ঢুকে গিয়েছে তাই অনুষ্ঠানের পাল্লা সম্পূর্ণভাবে জামাইয়ের দিকে ঝুঁকে গেছে।এই অনুষ্ঠানে জামাইকে রাজকীয়ভাবে যত্ন-আত্তি করা হয়।জামাইয়ের হাতে নতুন বস্ত্র তুলে দেওয়া হয়।তার জন্য পঞ্চব্যঞ্জন রান্না করা হয়।জামাইষষ্ঠীতে নিজের শ্বশুরবাড়িতে জামাইবাবাজি যে আদর আপ্যায়ন পায় সেই আদর-আহ্লাদ এবং ভালোবাসা থেকে বৌমা কেন বাদ যাবে?বৌমাষষ্ঠীতে শাশুড়ি-বৌমার আহ্লাদেপনার মুহূর্ত সৃষ্টি হলে ক্ষতি কি বল? 
মেয়েরা ঘরে-বাইরে পুরুষের সঙ্গে সমানতালে টক্কর দিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে দক্ষতার সাথে সংসার এবং অফিস সামলায়।তাই পারিবারিক কোনো এক নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানে কেবলমাত্র পুরুষের আধিপত্য থাকবে এই ব্যাপারটা আমি মন থেকে মেনে নিতে পারি না।আমাদের বাড়িতে পুত্রসন্তান বা কন্যাসন্তানের মধ্যে কোনোদিন ভেদাভেদ হয়নি।তাই আমি যদি জামাইষষ্ঠী পালন করতে পারি তাহলে বৌমাষষ্ঠী অবশ্যই পালন করবো।আমি মনে করি,বউমার জন্য বৌমাষষ্ঠী পালন করাটা শুধু প্রয়োজন নয় বরং বাঞ্চনীয়।ʙᴇᴄᴀᴜsᴇ ᴇᴠᴇʀʏ sᴜᴄᴄᴇssғᴜʟ জামাই,ᴛʜᴇʀᴇ ɪs ᴀ বৌমা”।
শাশুড়ি মায়ের মুখ থেকে এইকথাগুলো শোনার পর নীহারিকার দুচোখ জলে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো।এই কান্না দুঃখের নয়।আনন্দে আত্মহারা হওয়ার পরেও চোখে জল আসে।
এবার অনুরাধা দেবী নীহারিকার চোখের জল মুছিয়ে তার হাতের আঙ্গুলে হীরের আংটি পরিয়ে দেওয়ার পরে পাশের চেয়ারে বসলেন এবং কপালে চুম্বন দেওয়ার পরে ঘি দিয়ে ভাত মেখে খাওয়াতে আরম্ভ করলেন।অন্য চেয়ারে বসে শেখরবাবু তালপাতার পাখা দিয়ে বৌমাকে হাওয়া দিতে আরম্ভ করলেন।আনন্দে আহ্লাদিত হয়ে নীহারিকা তার মামনি এবং বাপির পা ছুঁয়ে আশীর্বাদ নিল এবং তারপরে দুইহাত দিয়ে তার মামণিকে জড়িয়ে ধরলো।

কলমে রুবি সেনগুপ্ত

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here