শিবাজীর অন্তর্ধান : কল্পবিজ্ঞান

0
76

“প্রখ্যাত বিজ্ঞানী সুকুমার মিত্রের যখন অন্তর্ধান হয় পাঁচ বছর আগে ২২৭৬ সালে , তখন সমগ্র বিশ্বের বিজ্ঞানী মহল একজোট হয়ে গিয়েছিল তাঁর অন্তর্ধান রহস্য সমাধান করতে। হবে না-ই বা কেন, তিনি তো আর যে সে বিজ্ঞানী নন… নোবেলজয়ী মহাকাশ বিজ্ঞানী তিনি। মহাকাশ বা মহাশূন্য সম্বন্ধে মানুষের আগ্রহ সেই আদিম যুগ থেকে, সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো যে আমরা ছাড়াও কি এই গ্যালাক্সিতে অন্য কোথাও প্রাণের সন্ধান আছে! এই প্রশ্ন সুকুমার কেও ভাবাতো।

‘অটোটেলিপোর্টো’ নামে একটা অত্যাধুনিক প্রযুক্তির যন্ত্র তৈরী করেন সুকুমার, এই যন্ত্রটা প্লাগ অ্যান্ড প্লে সিস্টেমে ব্যবহার করা যায় যেকোনো অত্যাধুনিক মহাকাশ যানের সাথে। যন্ত্রটা এতটাই অত্যাধুনিক যে সেটা যদি কোনো মহাকাশ যানে ইনস্টল করা যায়, তাহলে সেই যন্ত্রের মাধ্যমে ৫০০০ আলোকবর্ষের মধ্যে এই গ্যালাক্সির কোনো গ্রহে যদি প্রাণের উৎস মানে জল/বরফ থেকে থাকে তাহলে সেই গ্রহগুলো দূরত্বের ক্রমাণুসারে ফুটে উঠবে এই যন্ত্রের ডিসপ্লে তে আর তার মধ্যে থেকে আপনি কোনটায় যেতে চান সেটা বেছে নিলেই হলো….তাহলেই সেই গ্রহের সাথে মহাকাশ যানের একটা নিজস্ব পোর্টাল তৈরী করে দেবে এই যন্ত্র, যার মাধ্যমে মহাকাশযান ছুটতে পারবে সুপারসনিক গতিতে।

ইসরোর পাঠানো মহাকাশ যান ‘শিবাজী ২’ এর সাথে এই যন্ত্রটাকে প্যাচ করা হয় পরীক্ষামূলক ভাবে এবং ৭ দিনের রেকর্ড সময়ে সেই মহাকাশচারীরা শনি গ্রহের সবচেয়ে বড় উপগ্রহ টাইটানে গিয়ে ফিরে এসেছিলো। এই অসাধারণ আবিষ্কারের জন্যই সুকুমার নোবেলটা পেয়েছিলেন। সে প্রায় ৮ বছর আগেকার কথা। এরপরে আমাদের প্রজেক্ট টিম সিদ্ধান্ত নেয় যে এরপরের মহাকাশ যান যে গন্তব্য স্হির করবে সেটা আমাদের মিল্কি ওয়ে তে হবেনা। আমরা চেয়েছিলাম, দূরের অন্য কোনো গ্যালাক্সি তে ট্রাভেল করতে, সেখানের ডাটা সংগ্রহ করতে। সেই মতোই ‘শিবাজী ৩’ বানানোর কাজ শুরু করি আমরা আর কাজ শেষ হয় ২২৭৬ সালে। যেহেতু আমরা প্রথম বার একটা টিমকে আমার সৌরজগতের বাইরেই না, মিল্কিওয়ের বাইরে পাঠাতে যাচ্ছিলাম… সেই কারণে মনে একটা ভয় কাজ করছিলো যে যদি অত দূরত্বে গিয়ে ‘অটোটেলিপোর্টো’ কোনোরকম ভাবে গণ্ডগোল করে তাহলে তা সামলানো দরকার। এই কথা ভেবে প্রজেক্ট টিম আর গভার্নান্স বডি ঠিক করে যে সুকুমার মিত্রকেও সাথে পাঠানো হবে।

সুকুমার যথেষ্ট এক্সাইটেড ছিলেন ব্যাপারটা নিয়ে, আমি ওনাকে এই প্রস্তাব দেওয়ার পরে উনি জানান যে ওনার কাছে ‘অটোটেলিপোর্টো’ যন্ত্রের অনেকগুলো আপগ্রেডেড প্রোটোটাইপ আছে যেগুলো তিনি তৈরী করেছেন। বিশেষত্ব‌ হলো এই প্রোটোটাইপ গুলোর সবকটাই আরো বেশী দূরত্বে মহাকাশ যানকে নিয়ে যেতে পারবে। সেই মতোই একটা আপগ্রেডেড ভার্সনের যন্ত্র  ‘শিবাজী ৩’ এর সাথে প্যাচ করা হয় আর শিবাজী ৩ রওনা হয় ‘অ্যান্ড্রোমেডা’ গ্যালাক্সির উদ্দেশ্যে এবং ওই গ্যালাক্সির সবচেয়ে বড় গ্রহ ‘সুইপ ৬’ থেকে ডেটা সংগ্রহ করতে। এস্টিমেশন অনুযায়ী ওদের ফেরার কথা ছিলো ৮ মাসে। মিল্কিওয়ের শেষ গ্রহ গ্যালাক্টো-এক্স-১০ অবধি ‘শিবাজী ৩’ ট্র্যাকে ছিল কিন্তু তারপরেই রহস্যময়ভাবে  শিবাজী ৩ হারিয়ে যায়। গ্যালাক্সির সবচেয়ে শক্তিশালী সুপার টেলিস্কোপ “ক্লিয়ার ভিশন” এর মাধ্যমে আমরা কয়েক বছর আগেই এই রহস্যময় গ্রহটি আবিষ্কার করি। যে জিনিসটা একটু অদ্ভুত মনে হয়েছিলো, সেটা হলো যে এই গ্রহটির সম্ভবত কক্ষপথের কোনো ঠিক নেই, মানে “Rogue Planet” । গ্যালাক্টো-এক্স-১০ এর পরে একটা ভয়ঙ্কর জায়গা আছে মহাশূন্যে, নাম ‘দ্য মন্সটার হলো’, ব্ল্যাকহোল আর সেই ‘হলো’ কে ঘিরেই আছে প্রচুর টুকরো টুকরো পাথরের এক অদ্ভুত এবং ভয়ঙ্কর বলয়…এই বলয়টাও যেন হঠাৎ করেই আমাদের গ্যালাক্সিতে আবির্ভূত হয়েছে গ্যালাক্টো-এক্স-১০ এর মতোই, আমাদের অনুমান আমাদের স্পেসশিপ কোনোভাবে ওই পাথরের বলয়ে ধাক্কা মেরে ‘মনস্টার হলো’ তে হারিয়ে গেছে । কিন্তু প্রশ্ন হলো যে এত বছর পরে সুকুমার ফিরলেন কি করে?”

এই অবধি বলে থামলেন ইসরোর ‘শিবাজী’ প্রজেক্টের ম্যানেজার পনিরসেলভম। আমি এক প্রসিদ্ধ সংবাদ মাধ্যমের প্রতিনিধি হিসেবে ওনার প্রতিক্রিয়া নিতে এসেছি সুকুমার মিত্রের রহস্যময় আবির্ভাবের ব্যাপারে। বাইরের আকাশের দিকে একবার দেখে নিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম “উনি কেমন আছেন এখন?”

– উনি যথেষ্ট অসুস্হ আর যতদিন যাচ্ছে ওনার শরীরের অবনতি ঘটছে। খুব রহস্যজনক ভাবে ওনার শরীরে কিছু একটা ইনফেকশন দেখা দিচ্ছে, মহাকাশে মানুষের বেঁচে থাকার কোনো উপায় এখনো আবিষ্কার হয়নি। তাই উনি কিভাবে এতবছর মহাশূন্যে বেঁচে থাকলেন, তা ভাববার বিষয়। আমার মনে হয় উনি এমন কিছুর সংস্পর্শে এসেছিলেন অ্যাক্সিডেন্টের সময়, যা তাঁকে মহাশূন্যে বাঁচতে সাহায্য করেছে কিন্তু এখন তাঁর শরীর পৃথিবীর আবহাওয়ার সাথে খাপ খাওয়াতে পারছেনা। স্পেস ইজ অ্যা মিস্টিরিয়াস প্লেস।

কথাগুলো অত্যন্ত চিন্তার সাথে একমনে বলে গেলেন পনিরসেলভম। মনে হলো উনি অন্যকিছুর আশঙ্কা করছেন কিন্তু খুলে কিছু বলছেননা। আমি আর কিছু জিজ্ঞেস না করে সেদিনের মতো উঠে পড়লাম, পনিরসেলভম জানালেন যে নতুন কিছু তথ্য পাওয়া গেলেই উনি আমাকে জানাবেন।

দিন সাতেক পরের কথা…শহরের দক্ষিণ প্রান্তে একটা ক্যাফেতে বসে কফি খাচ্ছি। আকাশে মেঘ, বিদ্যুৎ চমকে উঠছে মাঝেমধ্যেই। জানিনা অন্য কেউ লক্ষ্য করেছে কিনা, আমি কিন্তু রাতের আকাশে একটা জিনিস খেয়াল করেছি। সন্ধ্যা রাতের আকাশে বেশ উজ্জ্বল এবং বড় কিছু নক্ষত্র দেখা যাচ্ছে যা আগে সম্ভবত ছিলোনা। এই নক্ষত্র গুলো অন্যান্য নক্ষত্রদের মতো ছোটো না, দিনদিন যেন তারা সংখ্যায় বাড়ছে আর তার সাথে আকারেও। মাঝে পনিরসেলভমের সাথে একবার কথা হয়েছিলো আমার সুকুমার মিত্রের ব্যাপারে। ওনার শরীরের আরো অবনতি হয়েছে এবং মাঝেমধ্যেই একটা কথা তিনি বলে চলেছেন– “স্টোনোমর্ফ…স্টোনোমর্ফ”, কথাটার মানে কেউ কোনোদিন উদ্ধার করতে পারবে কিনা জানা নেই, কারণ উনি ধীরে ধীরে মৃত্যুর মুখে ঢলে পড়ছেন । সারাদিন টিভিতে ওনাকে নিয়েই খবর চলছে… বিজ্ঞানী মহল অত্যন্ত চিন্তিত পৃথিবীর ভবিষ্যৎ নিয়ে।  সেসব দেখতে দেখতে আরো একটা সিপ নিলাম, হঠাৎ একটা ব্রেকিং নিউজ ফুটে উঠলো যা দেখে আমি এবং ক্যাফেতে বসে থাকা অনেকেই ভয়ে চমকে উঠলাম। খবরের সারমর্ম এরকম –

“ক্লিয়ার ভিশন” সুপার টেলিস্কোপের মাধ্যমে আবার গ্যালাক্টো-এক্স-১০ কে দেখার চেষ্টা করা হয়েছিলো কিন্তু ভয়াবহ বিষয় এই যে, গ্রহটি সেখানে নেই….নেই সেই ভয়ানক রহস্যময় বলয় যার সাথে ধাক্কা লেগে ‘শিবাজী ৩’ সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে যায়। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় এই যে ইন্টারন্যাশনাল স্পেস সেন্টার থেকে পৃথিবীর উদ্দেশ্যে একটি ডিসট্রেস সিগন্যাল কিছুক্ষণ আগেই পাঠানো হয়েছে এই বলে যে ঠিক সেইরকমই একটা ভয়ঙ্কর অসংখ্য পাথরের বলয় পৃথিবীর দিকে এগিয়ে আসছে। শুধু তাই নয়, সেই বলয়টিকেই পিছু করে বিশাল দৈত্যাকার কোনো স্পেসশিপের মতো কিছু একটাও সঙ্গে আসছে, যে স্পেসশিপের আনুমানিক আয়তন/আকার অদ্ভুত ভাবে গ্যালাক্টো-এক্স-১০ এর সাথে মিলে যাচ্ছে। আর…

টিভির সিগন্যাল হঠাৎ চলে গেল, সন্ধ্যা হয়ে এসেছে এখন। ভাবলাম , পনিরসেলভমকে একবার ফোন করি। বাইরে বেরিয়ে দেখি, সমস্ত সিগন্যাল বন্ধ হতে শুরু করেছে… পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে অ্যাক্সিডেন্টের খবর উড়ে আসতে লাগলো। মাথার পেছনের প্যানিক বাটনটা অন হয়ে গেছে আমার! আমার ফোনে তখনো সিগন্যাল একটু বাকি আছে। চটজলদি পনিরসেলভমকে ফোন করলাম…কথাগুলো পরিষ্কার ভাবে শোনা যাচ্ছে না। আমি কিছু বলার আগেই উনি বলতে লাগলেন, গলায় তাঁর ভয়ার্ত ভাব –

— সুকুমার মিত্রের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তিনি মরার আগে শেষ বারের জন্য সব বলে গিয়েছেন…. আমরা যেটাকে পাথরের বলয় বলে জানতাম, ওগুলো আসলে ভয়ঙ্কর এক এলিয়েন প্রজাতির প্রাণী যারা পাথরের মত রূপ ধারণ করতে পারে…নাম স্টোনোমর্ফ। এই স্টোনোমর্ফরাই শিবাজী ৩-য়ে আক্রমণ করেছিল, সেইসময় ধস্তাধস্তিতে সুকুমার মিত্রের ডিএনএ-এর সাথে এই স্টোনোমর্ফদের ডিএনএ রিঅ্যাকশন হয়, এই রিঅ্যাকশনটাই সুকুমার মিত্রকে এত বছর মহাশূন্যে বাঁচিয়ে রেখেছিল…. কোনোরকমে তিনি শিবাজী ৩-এর এস্কেপ পডে করে পালিয়ে যান। আর গ্যালাক্টো-এক্স-১০ আদতে কোনো গ্রহ না, স্টোনোমর্ফদের স্পেসশিপ যেটা ‘দ্য মন্সটার হলো’ ব্ল্যাকহোলের মধ্যে থেকে ট্রাভেল করে এসেছে অন্য কোনো ডাইমেনশন থেকে। আর তাঁদের লক্ষ্য শুধু এই পৃথিবী না….সমগ্র মিল্কিওয়ে!

আমি নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারলামনা, ভাবতে পারছিনা আমি আর!! হঠাৎ আকাশটা প্রচণ্ড আলোয় ভরে উঠলো, যেন খুব উজ্জ্বল কিছু উপর থেকে নীচের দিকে আসছে। পনিরসেলভম তখনো ফোনে আছেন।

– স্যার! এসব কি হচ্ছে!
– তুমি হয়তো জানোনা, গ্যালাক্টো-এক্স-১০ এক এক করে সব গ্রহকে ডিসলভ করে তাদের সমস্ত রিসোর্স নিংড়ে নিচ্ছে।
– তার মানে?
– মানে হলো, এখন যখন গ্রহ গুলোই নেই, তখন তাদের ঘিরে ঘুরতে থাকা উপগ্রহ গুলো ছিটকে যাচ্ছে আর ধেয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে।

আমি শেষবারের মতো আকাশের দিকে দেখলাম, অসংখ্য জ্বলন্ত গোলক এগিয়ে আসছে পৃথিবীর দিকে একটা একটা করে।

লেখক পরিচিতি : শোভন কাপুরিয়া, পেশায় তথ্যপ্রযুক্তি কর্মী কিন্তু লেখালেখি করতে খুব ভালোবাসি। বসবাস আপাতত পুনেতে কিন্তু কলকাতার সাথে আত্মিক টান এখন লেখালেখির মাধ্যমেই।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here