ভৈরবী নদীর ধারে বিশু হালদারের সাত পুরুষের ভিটে।আর তার এক পাশে চাটায় ঘেরা ,খড়ের ছাউনি তোলা এক টুকরো ঘর। জল ছুঁই ছুঁই উঠোনে ওর পূর্বপুরুষরা কাদা মাটি মেখে নদীর গর্ভ থেকে মাছ তুলে, হাটে বাজারে বিক্রি করে জীবন অতিবাহিত করত। এখন বংশানুক্রমে সে নদী এসে গিয়েছে বিশুর হাতে। ওই নদী যেন ওদের জমিদারীর অংশ। বিশুর এখনো মনে আছে তার বাপ মড়ার আগে বিশুর হাতে হাত রেখে বলে ছিল -“ওই ঘোলা জলে মাছ ধরিস, শহর মুখো হোসনা।” সেই জমিদারীর অংশ বুঝে নিয়ে বিশু মাথা নেড়ে ছিল। তখন ছিল সে ছেলে মানুষ। আজ  শক্ত পুরুষ মানুষ। মনের ভেতর শখ আহ্লাদ ঠাসা। ঘাড় উঁচু করে নদীর ওপারে ঝকঝকে শহর দেখে,বিশু ভাবে, স্বর্গ বলে যদি কিছু থাকে তাহলে ওপাড়েই।এপাড়ে সন্ধ্যে নামলেই যেন মনে হয় শ্মশানপুরী। নদী তে আর সেরম মাছ ওঠেনা। ওই দিয়ে কি জীবন চলে?

পরের বছর বিশু রাঙা বউ এনে ঘরে তুললো। পাড়ার বুড়ো মুংলা বললো- “কচি লাউ ডগার মতো বউ এনেছিস বিশু, । এবার সংসার টা গোজ গাজ কর।”
বিশু নদীর ওপারে গিয়ে পাকা ঘরে সংসার পাতবার স্বপ্ন দেখে, আর দীর্ঘশ্বাস ফেলে। প্রতি রাতে কুঁড়ে ঘরের চাল ফাঁক করে চাঁদের আলো নতুন বউ এর মুখে পড়লে হীরার মতো চক চক করে যৌবন। বিশুর এসব কল্পনার গতিবেগের সাথে পাল্লা দিয়ে চললো সময়।
এক সময় নদীর ওপারে খুললো প্লাস্টিকের কারখানা। পাড়ার ছেলে ছোকরারা  যে যেমন পেরেছে কাজে ঢুকেছে। অনেক ভেবে চিন্তে নদীর এপাড়ের ঝুপড়ি ছেড়ে লোটা কম্বল গুটিয়ে বউ এর হাত ধরে ঝুপড়ি ছেড়ে বিশু ছুটল ওপাড়ের স্বপ্নের নগরীতে । যেতে যেতে পিছন থেকে শুনেছিল বুড়ো মংলা বলেছিল- “যাসনে বিশু, ও ডাকে সাড়া দিস নে,, ও নিশির ডাক”।

কিন্তু , সাত পুরুষের ভিটেই কেবল পড়ে রইলো প্রথম নতুন বউ আগমনের আলতা মাখা পায়ের ছাপ।

ওপাড়ে ব্যস্ত শহর , আলোর ঝর্ণায় হাসি আর উল্লাস নিয়ে শুরু হলো নতুন জীবন। পীড়াপীড়ি করে জুটে গেল প্লাস্টিক কারখানায় চাকরি আর কারখানার লাগোয়া ভাড়ার পাকা ঘর,। প্রতি রাতেই ওই ঘরের জানলার ফাঁক দিয়ে বিশু নদীর ওপারে তার পরিত্যক্ত সাত পুরুষের ভিটে দেখলে , সেটা অন্ধকার কালো স্তুপ শ্মশান পুরী যেন মনে হয়। বর্তমান সুখের কথা চিন্তা করে এক গাল হেসে সে ঘুমিয়ে পড়ে। কারখানায় সকাল হতেই কাজ চলে। দূষিত পদার্থ নালি পথে গিয়ে মেশে ভৈরবী নদীর বুকে। কালো হয়ে ওঠে নদীর গর্ভ।

একদিন গভীর রাতে জন কোলাহলে ঘুম ভাঙে দুজনের। বিশু বিপদের আশঙ্কা করে বউ কে বলে-” যায় দেখে আসি, কি হলো? এতো চেঁচামেচি কিসের?। তুমি বেড়িও না এক পা। দোর এঁটে শুয়ে থাকো। এখন অনেক রাত।”

বিশু দরজা খুলে ছুট দেয় বাইরে, বিস্ফারিত চোখ নিয়ে সে দেখে কারখানা দাউ দাউ করে জ্বলছে। সকলেই জল ঢেলে চলেছে সাধ্যমত। বিশুও যোগ দেয়। এ যেন অভিশাপের আগুন । কিছুতেই নেভবার নয়। বৃথা চেষ্টা। অনেক পড়ে দমকল আসে। সকাল হতে চললো, তবুও উর্ধমুখী লেলিহান বহ্নিশিখার অহংকার বিন্দুমাত্র কমে না।সমস্ত পুড়ে ছাই। তার সাথে পুড়ে ছাই বিশুর রঙিন স্বপ্ন। ভাঙা মন,অশ্রুর বন্যা আর অবসন্ন শরীর নিয়ে ঘরের দিকে রহনা হয়ে চমকে ওঠে বিশু। কখন চুপিসারে কাল নাগিনীর মতো আগুনের লকলকে শিখা ছুঁয়ে গেছে তার ঘরের দোর। দ্রুত দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে, দেখে মেঝেতে পড়ে  খাপি খাচ্ছে তার বউ। আকাশের দিকে হা করে সমস্ত হাওয়া নিজের শরীরের ভেতরে নেয়ার চেষ্টা করে চলেছে ক্রমশ। দগ্ধ শরীর খানি তুলে নিয়ে গগন ভেদী চিৎকারে ফেটে পড়ে বিশু।

হাজারো হাঙ্গামার পর পুলিশ আসে। মৃত দেহ ছেড়ে উঠে যেতে হয় বিশু কে।বেলা গড়িয়ে গেলে মন্ত্র দেয়া পুতুলের মত নিস্তেজ ভাবে নিজের সাত পুরুষের সেই ভিটেই ফিরে আসে বিশু। দেখে ভৈরবী নদীর কালো বর্জ্য পদার্থ মিশ্রিত পঙ্কিল জল থেকে পাড়ে উঠে এসে হাজারো মাছ খাপি খাচ্ছে। সেই পুরোনো অদ্ভুত কায়দার খাপি। পৃথিবীর সমস্ত বায়ুমন্ডল যেন নিজের শরীরে টেনে নিতে চাই মাছেরা। সেই একই রকম খাপি। একটু আগেই যা বিশু তার বউ এর পুড়ে যাওয়া মুখটাই লক্ষ্য করেছিল। কি ভয়ঙ্কর, বীভৎস, কুৎসিত সে দৃশ্য।

কলমে আশিস চক্রবর্তী, সুকান্ত পল্লি, মুর্শিদাবাদ

 বর্তমানে একটি স্কুলে পার্শ্ব শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। ছেলে বেলা থেকেই লেখালিখি শুরু। দীর্ঘ সাত বছর নিজের একটি প্রিন্টেড পত্রিকার সম্পাদনা করেছি। বর্তমানে গল্প ,কবিতা , উপন্যাস ,নাটক , প্রবন্ধ , অনুগল্প প্রভৃতি কানাডা , অস্ট্রেলিয়া , বাংলাদেশ এবং ভারত থেকে নিয়মিত প্রকাশ হয়ে চলেছে -অনলাইন ও প্রিন্টেড আকারে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here