একটি বাস্তব গল্প ‌‌‌‌‌‌ – অনুগল্প

0
112
Photo : hairbuddha

ছ’টার একটু আগেই আজ ঘুমটা হঠাৎ ভেঙে গেল আইভির। বাথরুমে যাবে বলে দরজাটা খুলে বেরুতেই নিজে নিজে গজিয়ে ওঠা ছোট্ট নিমগাছটার কাছ থেকে দৌড়ে সরে যেতে দেখতে পেল ভারতীকে। ঘুমচোখে মাথা না ঘামিয়ে সে বাথরুমে চলে গেল বটে, কিন্তু বেরিয়ে ঘরের দিকে যেতে যেতে গেটের দিকে তাকিয়েই স্হাণু হয়ে গেল।এত অবাক বোধহয় জীবনে হয় নি সে ! রাস্তার দিকে তাকিয়ে দু’হাতে নিমের পাতাগুলো ছিঁড়ে কুটি কুটি করছেন ভারতী আর পায়ের কাছে ঝরে ঝরে প’ড়ে জমা হচ্ছে সেগুলো।

কিন্তু ভারতীর কাছে হঠাৎ ঐ নিরীহ নিমগাছটা এতো জাতশত্রু হয়ে উঠল কবে থেকে আর কেনই বা! আসলে শত্রু গাছটা নয়, বোধহয় আইভিকে ঠিক হজম করতে পারছেন না ভারতী।ভারতীর ব্যাপার-স্যাপার দেখে আইভির মনে হয়, ওনার ধারণায় বোধহয় ওর সর্বস্বর ওপর একছত্র অধিকার আছে ওঁর!সর্বস্ব মানে সর্বস্ব! টাকা-পয়সায় তো বটেই, শরীর-মন, চিন্তা-ভাবনায়ও। পয়সা খরচ তো ও করবেই, উপরন্তু রান্নাঘরে বসে সস্তার সব্জী কাটতে কাটতে কতটা পরনিন্দা-পরচর্চা করতে হবে ওকে,তা-ও পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে যেন থাকা চাই ওঁর।কার্য্যক্ষেত্রে দেখা গেল, অতটা নরম মাটিও নয় আইভি। কিন্তু তাই বলে খুবই কি দুর্বিনীত, উদ্ধত, ব্যবহারে অ-সভ্য ও? কথাগুলো মনে হতেই হেসে ফেলে আইভি, মনে মনেই! Practically, বাড়িঘরের যা অবস্থা সুপ্রকাশের, এখানে ঢোকারই কথা না ওর! নিজের উপর ভরসা করে ঢুকে পড়েছিল, এখন আস্তে আস্তে বোধ হচ্ছে, ভুল করেছে।যাই হোক, কিন্তু এখন এটা কি দেখল ও! ছোট্ট নিমগাছটা পাতা ছিঁড়ে ছিঁড়ে ন্যাড়া ক’রে দিয়ে মেরে ফেলার আয়োজন করছেন ভারতী আর সেদিন গাছটার দিকে নজর পড়াতে সুপ্রকাশকে বলেছে,”কে বলতো বুড়ো বুড়ো পাতাগুলো ছিঁড়ে নিচ্ছে….” কাজের মেয়েটার কথা ভেবেছে। তারপরও বলেছে,”কিন্তু নিমপাতা ভেজে খেতে গেলে খানিক তেল দরকার…..ও কি হবে! তাছাড়া, বুড়ো পাতা খাওয়াও যায় না!”

একটু সময় আছে এখনও, শুয়ে পড়ল বটে কিন্তু আজ আর ঘুম আসার চান্স নেই!”ধুত্তেরি”,বলে উঠে পড়ল আইভি, বরং অফিসের জন্য তৈরী হওয়া যাক্! রুটিন মাফিক কাজগুলো সেরে, স্নান সেরে যখন শাড়ী পরছে সুপ্রকাশ উঠলো। আইভি আর পারলো না, কুঁচি ঠিক করতে করতে বলল,”আজ চোর ধরেছি।” “কিসের?”
“নিমগাছটার।”
“কে?”
“তোমার মাতাঠাকুরানী!”,অপাঙ্গে তাকালো আইভি।সুপ্রকাশ মাথা নীচু ক’রে কথাটা শোনা আর না-শোনার মাঝখান দিয়ে ডজ্ করল যেন! বেরিয়ে গেল ঘর থেকে।আইভিরও আর সময় নেই…..! সারাদিন কাজের ফাঁকে ফাঁকে মাঝে মাঝেই নিমগাছটা উঁকি দিয়ে গেল মনে।আহারে!

দিনশেষে বাড়ী ফিরে আয়ামাসীকে দেখতে পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো আইভি। যাক্, দেরীতে এসেছে তাহলে!যবে থেকে রান্নাঘর থেকে ওকে বের করেছেন ভারতী,ওর সংসার হয়েছে ছেলে আর এই আয়ামাসীকে নিয়ে। নামেই আয়া, আসলে হেল্পিং হ্যান্ড।ছেলেও একটু বড় হয়ে গেছে, আর দরকারও নেই। বরং এইসময় কিছু সব্জী আগাম কাটিয়ে রাখে ও, সুবিধে হয়।আজও কি কি করতে হবে ব’লে দিয়ে উঠে যেতে যেতে আইভি বলল,”নিমগাছটা দেখেছেন মাসী?”
যাঁহাতক বলা,”দেখবো না আবার!”,মাসী সরব হল,”কে করলো বলুন তো বৌদি এই দশা?”
কিছু বলার দরকার ছিল না,মাসী তখন বলে চলেছে,”কি সুন্দর গাছটা হয়েছিল!আপনি ক’দিন নিম-বেগুন করলেন,কী পছন্দ ক’রে খাচ্ছিল দাদাভাই!….ও ঘরে ওরা তো রোজ জিজ্ঞেস করে,কি খেলি,কি কি রান্না করেছে__ তা সেদিন দাদাভাই কি সুন্দর করে বোঝাচ্ছিল,তেতো হলেও নিম-বেগুনের স্বাদ কত ভালো,কত উপকারী…..”
শেষের কথাগুলো আর কানে ঢুকছিল না আইভির!

 

লেখিকা পরিচিতি : মানসী ব্যানার্জী

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here