পদ্মপাতা | ষষ্ঠ পর্ব

0
366
Photo by Smita Basu

১১
“……ফুল,ফুল”

” এই যে মা, আমি আছি তো,”

হ্যাঁ ,আমার ডাক নাম ফুল।দাদু ডাকতো ‘পদ্দফুল’ বলে।সেখান থেকেই ছোট করে ফুল।আমার যখন বয়স তিন মাস,(যদি মাতৃগর্ভ এর সুচনা কাল থেকে বয়স গোণা হয়,তবে)…আমার বাবা,নিতান্ত অবিবেচকের মতো এক দুর্ঘটনা য় মারা যান।যদিও উদ্দেশ্য ছিল মহৎ।রাতের বেলা এক বেপরোয়া ট্রাক কে থামাবার জন্য বারাসাত উল্টোডাঙার ও,সি লড়ির সামনে
দাঁ ড়িয়ে পড়েন।লড়িটি তাকে পিষে প্রায় আধ কিলোমিটার ছেঁচড়ে নিয়ে যায়।আইনভংগকারী দের শাস্তিবিধান করতে গিয়ে, আমার না দেখা বাবা প্রাণ বিসর্জন করেন।

আমার মাকে বাবার মৃতদেহ দেখতেও দেওয়া হয় নি।দাদু তখন বেঁচে,,উনি চান নি,মেয়ে প্রবল মানসিক আঘাত পাক।অবশ্য শুনেছি, দেখার মতন কিছু অবশিষ্ট ছিল না,,শুধু একদলা রক্তমাখা মাংসপিন্ড ছাড়া।
তারপর থেকে শুরু হল আমাদের অস্তিত্ব এর জন্য লড়াই।সসম্মানে বেচে থাকার লড়াই।নিকট আত্মীয় বন্ধু সবাই চেয়েছিল মা, বাচ্চার দায়িত্ব থেকে মুক্ত হয়ে নতুন করে জীবন শুরু করুক।কিন্তু মা সবার বিপক্ষে গিয়ে আমায় জন্ম দেন।

অনেক দৌড়াদৌড়ি করে কম্পেনসেশন গ্রাউন্ডে মা পুলিশ বিভাগে কনস্টেবল এর চাকরী তে যোগ দেন,আমার তখন দুবছর বয়স।আমার বোকাসোকা নরমসরম মা, পুলিশের চাকরী করার জন্য একান্তই অনুপযোগী মা,অফিস থেকে বাড়ি এসে রোজ বমি করতো। যেদিন জেল থেকে বিচারাধীন বন্দী দের কোর্টে নিয়ে যাবার ডিঊটি পড়তো, সেদিন জেলের অশ্রাব্য গালিগালাজ শুনে বাড়ি এসে ঘন্টার পর ঘন্টা স্নান করতো,,,,,,,,বোধহয় ধুয়ে ফেলতে চাইতো, সব গ্লানি।
দাদু তখনো বেঁচে। এর বছর পাঁচেক এর মধ্যেই, মা আর আমাকে সামলাতে সামলাতেই একদিন ঝুপ করে চলে গেলেন,আমাদের নাগালের বাইরে।
এবার সত্যিই অনাথ হলাম, মা আর মেয়ে।

রাত্রিবেলায় মা,কেমন যেন গুটিসুটি মেরে শুয়ে ঘুমোত,দেখে ভারী মায়া হোত আমার।আমি আমার ছোটছোট হাত দিয়ে জড়িয়ে রাখতাম মা কে।আজ ও রাখি।শুধু আজ মা হয়ে গেছে ছোট্ট মেয়ে,আর আমি বড়, অনেক বড়।আমার ছোট্ট মেয়ে আমার মা,খেয়েও বলে খাই নি।বাথরুম পেলে বাথরুমে ধরে নিয়ে না গেলে বারান্দাকেই বাথরুম ভেবে হিসু করে ফেলে।আর খালি বাবাকে খোঁজে। সকাল সন্ধ্যে খালি জিঞ্জেস করে,
“তোর বাবা ফিরলো, ডিউটি থেকে? ”
বাবার মৃত্যুর বিষয় টা কি করে যেন স্মৃতি থেকে একদম মুছে গেছে আমার আলঝাইমার্স রোগী মায়ের মন থেকে।
১২.
“মা গো,একটু স্থির হয়ে শুয়ে ঘুমোবার চেষ্টা কর।আমি আছি তো,তোমার ফুল,তোমার পাশে।………..
বাবা তো রাতে ফিরবে না,মা।আজ তো বাবার নাইট শিফটে ডিউটি।সকালে ঠিক চলে আসবে।এখন একটু ঘুমোও।”

ঘুমিয়ে পড়েছে।এখন আমি কাজে বসবো। একগাদা অর্ডার আছে সামনে র মাসে,এক মাড়োয়াড়ি বিয়ের।কুড়ি জনের জন্য লেহেঙ্গা শাড়ি বানাতে হবে।তাও আবার প্রত্যেকটা আলাদা ডিজাইনের হতে হবে।ভাবছি টিসু আর মস্লিনের ফেব্রিক ব্যাবহার করবো।যাই, ডিজাইন গুলো ফাইনাল করে ফেলি।দুধ ঘি খেয়ে খেয়ে একএকজনের এমন চেহারা হয়েছে,,,,কি যে পরাই এদের, ভাবছি।

গেলাম পদ্দফুল।পরে আবার দেখা হবে।আমি এখন পদ্দা রয়।পেশাদার ফ্যাশন ডিজাইনার। যে পপুলার ডিজাইনিং এর পাশাপাশি ব্যাবসাটাও ভালো বোঝে।জীবনের সব ক্ষেত্রই যে লাভ ক্ষতির হিসেবে পরিমাপ করে।।যে জিততে চায়।যে কোন মুল্যে।
সত্যিই কি চায়!!!!সত্যি কী চায়!!!!

(চলবে)

 

Poet Smita Basu

লেখিকা স্মিতা বসু . প্রেসিডেন্সি কলেজে এ ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা ও দীর্ঘ ২২ বছর শিক্ষিকা হিসাবে ভূগোল পড়ালেও , আবৃতি -কবিতা -লেখালেখির সাথে সস্পর্ক মেয়েবেলা থেকেই।

 

 

 

<<পঞ্চম পর্ব                                                                                              পরবর্তী :ক্রমশ>>

 

লেখিকার আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন "সেই-গাছটা" "অন্ধকারের-উৎস-হতে"                                                                                   

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here