পদ্মপাতা । চতুর্থ খন্ড

ধারাবাহিক

2
358
Photo by Smita Basu

৮.
আজ একটা অন্যরকম দিন।কিসে অন্যরকম?সে অনেক কারন।যেমন,আজ বুঝলাম,,,,আমি সত্যি সত্যিই প্রেমে পড়েছি।সেই ক্যাবলা ছেলেটার।আপাত দৃষ্টিতে, এতে আনন্দিত হয়ে গদগদ হবার কারণ নেই।
তবে,,,জীবন টা নিয়ে একটা এক্সপেরিমেন্ট করার সুযোগ পাওয়া গেলো,আর কি। আরে মশাই,, জীবনে ক্যাবলাকান্ত,হাদারাম মানুষ গুলোর ও দরকার আছে।সবাই চালাক হলে, ভাবুন তো কি বিতিকিচ্ছিরি ব্যাপার হত।

তবে ছেলেটা আদৌ ক্যাবলা কিনা, আজকাল তাতে সন্দেহ হচ্ছে। বিশেষত,আজকে বিকেলের পর থেকে।,আজ, আমি যখন বললাম,……….’আমি বাপু বিয়ের ঝামেলায় যেতেরাজি নই।এসো,বোস,খাও,পিও,,,,,,কেটে পড়ো। দাঁ ড়ানো থেকে বসা পর্যন্ত চলতে পারে।তবে মাঠেঘাটে বসতে পারবো না বাপু।’

কেমন নির্দ্বিধায় বলে দিল,’ওকে,আপত্তি নেই।বিয়েতে প্রচুর ঝামেলা।’
‘যা ত্তেরি,,,ভাবলাম ঘ্যাম দেখাবো,,,আর বিয়ের জন্য বাছা কাকুতিমিনতি করবে,,,ও হরি।সে গুড়ে বালি।
তারপর থেকেই মনে হচ্ছে,উজবুকটার প্রেমে সত্যি সত্যি ই পড়েছি।’
তবে, ছেলেটাকে সুবিধাবাদী মনে করবেন না যেন।মানে,,যেমন হয় আর কি ছেলেরা,’লুটকে লেনেওয়ালা ‘ টাইপ। তেমন নয়।ভদ্র,বিনয়ী,, , কিন্তু, কোথাও যেন একটা গোলমাল আছে।যা বলি সব কিছু মেনে নেওয়াটও ঠিক ,,,হজম হচ্ছে না,,,কোন কিছুতেই প্রতিবাদ নেই,,,,,,,, হু হু,,,ব্যাটাকে ঝাঁকিয়ে, দেখতে হচ্ছে।প্রেমে পড়েছি বলেই,,,পেছন পেছন ল্যাং ল্যাং করে ছুটতে হবে,এমন মা কি বেটি আমি নই।

ইয়েস,আমি পদ্মা রয়,,,,মায়ের মেয়ে।মা আমায় বড় করেছে।আমার মা আজ থেকে ২৪বছর আগেই সিংগল মাদার হবার সাহস দেখিয়েছিলো।বাবার নামটা জানি বটে,কিন্তু আমার সব সার্টিফিকেট এ আমি মায়ের ই মেয়ে।মা বাবার সেপারেশন হয়েছিল আমার জন্মের ঠিক দুমাস সাতদিন আগে।কেন,,সে পরে কোন এক সময় বলা যাবে।
এই…..যা,,,মায়ের জন্য প্রেসারের অষুধটা নিয়ে ভুলে গেলাম।ধুত্তোরি।আজ মায়ের বিকেলের আয়া আসবে না।সকালের জনকে রাত আটটা পর্যন্ত থাকতে বলেছি।তারমধ্যে,বাড়ি ঢুকতে হবে।

“এই ট্যাক্সি……..রোককে,,,,,এসপ্ল্যানেড যানা হ্যায়।উহাসে রাসবিহারী…. চলোগে”

চললাম,পরে বকবক করবো,,,এখন খুব তাড়া,,,,আটটার মধ্যে বাড়ি ঢুকতে হবে।বাই।

৯.
অত্যাধিক এনার্জি কি ডিপ্রেশন এর ঠিক আগের সিম্পটম?কি জানি,হবে হয়তো।আমার তো শুধু আলো- অন্ধকারে আসা আর যাওয়া।এখন আলোয় আছি।গানে আছি,”কুসুমে কুসুমে চরণ চিহ্ন দিয়ে যাও”
কতো দিন বাদে আজ গান শুনলাম।ছাদে গেলাম।বুগেনভেলিয়ার ডালে হাত বোলালাম।ওকে,মানে অর্কজিৎ কে টি পট থেকে চা ঢেলে দিলাম।কেন দিলাম?এখনো কি তবে আবেগ মরে নি।নাকি নিছক অভ্যেস।নাকি আনুগত্য? আমি কি কোনদিন অনুগত ছিলাম?

মাঝে মাঝে ভাবি প্রতিবাদ করছি ভেবে সারাজীবন খালি সহ্য করে গেলাম,নিজেকে বঞ্চিত করে গেলাম।যার উপর অভিমানে গুটিয়ে এতটুকু ধুলোকনার মত দিন যাপন করলাম,সেকি বুঝল,,,তার কি কিছু এলো গেল?

নাকি ভয়? ভয়ে চুপ করে ছিলাম।আমার এই ভয়টাই,,বুঝি ছেলের মধ্যে সঞ্চারিত হয়েছে।কোন কিছুতেই প্রতিবাদ নেই।নাকি আমার মতো মনে মনে বিদ্রোহী। যেদিন আগল ভাঙবে, সব ভাসিয়ে নিয়ে যাবে।
মাঝেমাঝে বড় মায়া হয়। মনে হয়, মানুষটার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলি,’সারাজীবন খালি আনুগত্যই পেলে,,,,এই কি মানুষের চাওয়া,,খালি আনুগত্য !’

“…..ওহে চঞ্চল,বেলা না যেতে খেলা তব কেন যায় ঘুচে”
দেবব্রত না কি সাগর সেন?এখন সাগর সেন।মধ্য রাতে দেবব্রত..”…কুসুমে কুসুমে চরণ চিহ্ন দিয়ে যাও….”

অর্কজিত,তুমি ভারি একগুঁয়ে,,, কিন্তু এভাবে কি সবকিছু অনায়াসে জয় করা যায়?তুমি যখন তীব্র আক্রোশে চিৎকার কর,,আমি তখন মনে মনে কাঞ্চনজঙ্ঘার সূর্যোদয় দেখি।তুমি যখন আঘাত কর,আমি তখন তরাইয়ের অরণ্যের কোন অজানা পথে মূর্তি নদীর দিকে হেটে যাই।

বড় মায়া হয়,,,,সেই কলেজবেলার অর্ক যেন চকিতে দেখা দিয়ে যায়।আমি অমনি তার পেছন পেছন ছুটি,,,,আজ ও আমায় ছুটিয়ে মারো!!!
,,,আজ ও তোমার থুতনির ভাজে আটকে থাকে, আমার প্রথম শাড়ি পরার শিহরন ।এখনো মাঝে মাঝে তোমার কপালের শিরাটা ফুলে ওঠে,,,যেমন আগে উঠত,,,,,,যেমন আগে……না থাক,মাথাটা বড় টিপটিপ করছে।আর ভাববো না।দেখি,,, রু ফিরলো কিনা।

হ্যা,,রু….আমার আর অর্কজিৎ এর একমাত্র ছেলে।বড় শখ করে ছেলের নাম রেখেছিলাম “অভিঞ্জান” কিন্তু অর্কজিৎ বদলে দিল।রু এখন প্রতাপ। আমার ছোট্ট রু। আস্তে আস্তে অভিঞ্জানের বদলে প্রতাপ হয়ে উঠলো। পোষা পায়রার মতো খোলা আকাশে উড়েও বাঁ ধা পড়ে রইল অর্কজিৎ এর ঠুনকো আভিজাত্য র খুপরি তে।

( চলবে)

 

 

Poet Smita Basu

লেখিকা স্মিতা বসু . প্রেসিডেন্সি কলেজে এ ভূগোল নিয়ে পড়াশোনা ও দীর্ঘ ২২ বছর শিক্ষিকা হিসাবে ভূগোল পড়ালেও , আবৃতি -কবিতা -লেখালেখির সাথে সস্পর্ক মেয়েবেলা থেকেই।

 

 

 

<< তৃতীয় পর্ব                                                                                               পঞ্চম পর্ব >>

লেখিকার আরো লেখা পড়তে ক্লিক করুন "সেই-গাছটা" "অন্ধকারের-উৎস-হতে"                                                                                   

2 COMMENTS

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here